× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সহজ সুরক্ষিত সাশ্রয়ী সেবা

আহমেদ ফেরদাউস খান

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:০৮ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ধরুন, আপনি ব্যাংকের যাবতীয় কার্যক্রম ঘরে বসেই করছেন; বিশেষ করে টাকা তোলা, ঋণ নেওয়া বা এলসি খোলার মতো কাজগুলো। বিষয়টিকে এখন কাল্পনিক মনে হলেও ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে বাস্তবে খুব সহজে এসব সেবাই পাওয়া যাবে ঘরে বসেই। কেবল সহজ নয়, সুরক্ষিত ও সাশ্রয়ী এই সেবা আপনার সময় বাঁচাবে। আপনার ব্যাংকিং কার্যক্রমকে নিরাপদও রাখবে। আর এসবই সম্ভব হবে ডিজিটাল ব্যাংক সম্পর্কিত একটি অ্যাপের মাধ্যমে।

ডিজিটাল ব্যাংক এমন এক ব্যাংক, যার কোনো শাখা নেই। অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় অনলাইনে; টাকা লেনদেন, ঋণ দেওয়া, বিনিয়োগ, সঞ্চয়সহ সব ধরনের সেবা মেলে অনলাইনে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কয়েকটি ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য গ্রাহকের কাছে ‘ব্রাঞ্চলেস ব্যাংকিং’ পৌঁছে দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, শাখাবিহীন এই ব্যাংক পরিচালন খরচ কমাবে এবং সেবার দক্ষতা বাড়াবে। তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের ওপর একদিকে চাপ কমাবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী সেবা পৌঁছে দেবে।

মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ব্যাংক মিলে ব্যাংক খাতে এভাবেই সূচনা করতে চলেছে এক নতুন যুগের। ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে দেশ প্রবেশ করছে নগদবিহীন বা ক্যাশলেস সেবার নতুন এক পর্বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাত বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনাকালে ডিজিটাল লেনদেন কার্যক্রম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মানুষের ব্যাংকিং কার্যক্রমের ধরনে পরিবর্তন আসে। এখন ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানো ছাড়াই বেশিরভাগ কাজ করা হচ্ছে মোবাইল ফোন ও অ্যাপের মাধ্যমে। প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যাংক পুরোদমে কাজ শুরু করলে এই পরিবর্তন পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।

শহর-গ্রামের আর্থিক সেবার বৈষম্য কমবে

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে শহর-গ্রামের আর্থিক সেবার বৈষম্য কমবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, প্রবাসী আয় ও শ্রমজীবী মানুষের ব্যাংকিং সুবিধা বাড়বে। পাশাপাশি দেশে ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’ গড়ে তুলতে এই দুটি প্লাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন পেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আরও দ্রুত ও সহজে ঋণ পাবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনলাইন সেবা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম আধুনিকায়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এজেন্ট ব্যাংকিং আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। খাতটির বিকাশে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

ন্যূনতম মূলধন ৩০০ কোটি টাকা

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় শতভাগ শাখাহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে যেতে ফের ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ধারার ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিবেশী দেশগুলোতে তথা সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এটি নতুন ধারণা। তবে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী, এমএফএস, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা এবং ডিজিটাল-ফার্স্ট গ্রাহকদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত বলেই মনে করা হচ্ছে। 

এমন প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য ন্যূনতম মূলধন ১২৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। গত ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারে এই তথ্য জানায়। ওই সার্কুলারে বলা হয়, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ১৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে শাখাবিহীন ডিজিটাল ব্যাংক-কোম্পানি স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করল।’

২০২৩ সালের ১৫ জুন ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা ঘোষণা করেছিল, তাতে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছিল। নতুন প্রজ্ঞাপনে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা করা হলেও আগে জারি করা নীতিমালার অন্য সব শর্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

লাইসেন্স ইস্যু

২০২৩ সালের আগস্টে নগদ ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির নামে প্রথম এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে নগদ ব্যাংক পিএলসি নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অভিযোগ ওঠে, পাচারের টাকায় বিদেশে কোম্পানি খুলে এসব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ কারণে নগদ ব্যাংক পিএলসির লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কড়ির নামেও এখনও লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি।

এদিকে ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, বাংলাদেশে এখনও তা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীর টাকাও ফেরত দিতে পারছে না। এসব কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালকদের কেউ কেউ নতুন আবেদন না চাওয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের আগামী সভায় এ বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করার কথা রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, গত সরকারের সময় যে প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়, তা ছিল রাজনৈতিক। সরকার পতনের পর দেখা দেখে, নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত পাঁচ কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ফিনক্লুশন ভেঞ্জারস পিটিই লিমিটেড এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত চার কোম্পানি ব্লু হেভেন ভেঞ্চারস, অসিরিস ক্যাপিটাল পার্টনার্স, জেন ফিনটেক এবং ট্রুপে টেকনোলজিস।

কম সুদে ঋণ পাবেন উদ্যোক্তারা

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি একেএম ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংকগুলো সুবিধা পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া ২০ থেকে ২৬ শতাংশ সুদের হারের তুলনায় কম সুদে ঋণ পেতে পারবেন।’

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিষয়টি এদেশে এখনও অনেকটা অপরিচিত। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কী কী সেবা নিয়ে আসছে, যা প্রচলিত ব্যাংকগুলো দেয় না এখন তা-ই দেখার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সঠিক জনবল খুঁজে পাওয়া।’ এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ব্যাংকের ব্যাপারে জনসচেতনতা, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং বিপণন চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

ব্যাংকিং এখন গ্রাহকমুখী

বহুকাল আগে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য লেনদেন হতো। কালের বিবর্তনে এখন এই লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে কাগুজে মুদ্রা। তবে সেই দিনও শেষ হয়ে আসছে ডিজিটাল ব্যাংক আবির্ভূত হওয়ার সূত্রে মানুষের দরজায় কড়া নাড়ছে ডিজিটাল মুদ্রা। ব্যাংকিং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কয়েকটি সংখ্যার আদান-প্রদান করলেই ঘরে চলে আসছে প্রয়োজনীয় পণ্য। সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তন এসেছে লেনদেন-সংক্রান্ত গতানুগতিক ধারণায়। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে এসেছে ব্যাপক বাস্তবমুখী অভূতপূর্ব পরিবর্তন।

এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ভিসা কার্ড ও মোবাইল ভিত্তিক লেনদেন বর্তমানে ব্যাংকিংকে নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। ব্যাংকিং সেবা এখন গ্রাহকের একেবারে ঘরে পৌঁছে যাওয়ার কারণ, কার্ডবিহীন লেনদেনের অবারিত সুযোগ। সুতরাং, বলাই যায়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ডিজিটাল মুদ্রা ও ডিজিটাল ব্যাংক এবং ঋণের জামানত হিসেবে অস্থাবর সম্পত্তির ব্যবহার ব্যাংকিংয়ে সরলীকরণের নতুন মাত্রা যুক্ত করবে। এ ছাড়া নগদবিহীন সমাজ (ক্যাশলেস সোসাইটি) গড়ার চলমান উদ্যোগ তো রয়েছেই। মূল কথা, ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক নয়, ব্যাংকিংই হবে আরও বেশি গ্রাহকমুখী। এ কারণেই ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার যথার্থ অনুধাবন করে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বখ্যাত বিল গেটস বলেছিলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং দরকার, আমাদের কি আসলেই ব্যাংক দরকার?’

ব্যাংক খাতের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কারণে গ্রাহকের মন থেকে দূর হচ্ছে জাল টাকার ভীতি এবং সময়সূচি মেনে লেনদেন করার তাগিদ। নতুন ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে ব্যাংকগুলো; প্রস্তুতি নিচ্ছে এক ক্লিক বা একটি বাটনের চাপেই সেবা দেওয়ার। এ ছাড়া অ্যাপসের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সেবা তো আছেই। বর্তমানে গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন ও সেবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রয়েছে দুই থেকে পাঁচ স্তরের ডিজিটাল নিরাপত্তাবলয়, মোবাইলে বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে গ্রাহক শনাক্তকরণ ও ওটিপি (অনটাইম পাসওয়ার্ড) কোড পদ্ধতি।

অবশ্য মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ব্যাংক এ দুটো সেক্টর কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যেও রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা ও ডেটা সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, অনলাইন সচেতনতার অভাব ও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ ভোক্তাদের কোনো কোনো সময় ভোগান্তিতেও ফেলছে।

শুরুর দিকটা যেমন ছিল

বর্তমানে ব্যাংক বলতে শুধু আমানত কিংবা জামানত-গ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় না। এটি কেবল ঋণ প্রদান বা ঋণ আদায়কারী সংস্থাও না। অধিকাংশ ব্যাংকের সার্বক্ষণিক সেবা কার্যক্রমই এখন নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোও গ্রাহকের ব্যবসা-বাণিজ্য, দেনা-পাওনা ও কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, কর প্রদান, কোর্ট ফি, ভর্তি ফি, পরীক্ষা টিউশন ফি ও জরিমানা প্রদানসহ যাবতীয় সেবা দিচ্ছে। চিকিৎসার ফি, টাকা ট্রান্সফার ও মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রবাসী আয় তথা রেমিট্যান্স সংগ্রহেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ব্যাংকগুলো।

দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সূচনা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে মোবাইল ফোন ব্যবহারের পর। তখন অনেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংক সেবা চালুর ভাবনা শুরু করেন। এভাবে প্রায় দেড় যুগ চলে যাওয়ার পর ২০১০ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদান নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হয়। দেশে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু ২০১১ সালের মার্চে। বেসরকারি খাতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করে। এরপর আসে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। পরবর্তীতে নগদ, এমক্যাশ, উপায়, শিওরক্যাশসহ ১৫টি ব্যাংক এ সেবা চালু করে। সারা দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য নিবন্ধন করেছে ২১ কোটির বেশি মানুষ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের টাকা জমা করতে এখন আর এজেন্টদের কাছেও যেতে হয় না। ব্যাংক বা কার্ড থেকে সহজেই টাকা আনা যাচ্ছে এসব হিসাবে। ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়ী আমানতের কিস্তিও জমা দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে ডিজিটাল সেবা শুরু হয় প্রায় এক যুগ আগে। শুরুর দিকে ব্যাংক থেকে ব্যাংক ডিজিটাল আন্তঃসংযোগ শুরু হয়। আগে একটি ব্যাংকের চেক অন্য ব্যাংকে জমা দিয়ে টাকা তুলতে সাত দিন লেগে যেত, এখন সকালে জমা দিলে বিকালেই পাওয়া যায়। এরপর এলো ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার)। ফলে ঘরে বসে মোবাইল বা অ্যাপের মাধ্যমে এক ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করা যাচ্ছে। এটিএম কার্ড আসার শুরুর দিকে কোনো ব্যাংকের কার্ড কেবল সেটির এটিএম বুথেই ব্যবহার করা যেত। এখন সেখানেও আন্তঃসংযোগ ঘটেছে। কেনাকাটার সময়ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন আন্তঃসংযোগ আছে।

যুক্ত হয়েছে নানা সেবা

ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় গতি এনেছে মোবাইল ব্যাংকিং। এর উন্নয়ন ঘটেছে কয়েকটি ধাপে। প্রথম পর্যায়ে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) লেনদেনে। পরে সেখানে ব্যক্তি থেকে ব্যাংক (পিটুবি) ও গভর্নমেন্ট থেকে পারসন (জিটুপি) পেমেন্টে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়। বর্তমানে অ্যাডভান্স কিছু ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্ট এসেছে। যেমন সেভিংস, ক্রেডিট বা এই ধরনের আরও কিছু প্রডাক্ট। এই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বড় একটি কাস্টমার গ্রুপকে অ্যাডভান্স ইউজার করে তোলার চেষ্টা চলছে। ফলে এক দশকে বিভিন্ন ধাপে বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে।

এখন এমএফএস টু এফএফএস অর্থাৎ বিকাশ থেকে রকেট, রকেট থেকে বিকাশে লেনদেন করা যায় না। এটা একটা বড় সমস্যা। ব্যাংক টু এমএফএস বা এফএফএস টু ব্যাংক এবং কার্ড টু ব্যাংক বা ব্যাংক টু এমএফএস এমন বিভিন্ন পরিসরে সেবা দিচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। বিকাশ থেকে রকেট বা রকেট থেকে নগদে লেনদেন, মার্চেন্ট পেমেন্ট অর্থাৎ বিকাশের মার্চেন্টে রকেট দিয়ে পেমেন্ট করা এরকম প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি আমাদের এখনও নেই। এই বাধাগুলো যত কমবে, মানুষ তত স্বস্তি পাবে, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিও তত বাড়বে। কোভিডকালে এ সেবার ব্যবহার যেভাবে বেড়েছে, আন্তঃসংযোগ পদ্ধতি চালু হলে এর পরিমাণ আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বর্তমানে প্রযুক্তি হলো গ্রাহকদের ব্যাংকিং পরিষেবা সরবরাহের মূল চাবিকাঠি। ব্যাংকগুলো যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময় গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কারণে গ্রাহকদের মধ্যেও নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যাংকগুলোকে তাদের সব শাখায় এটিএম, টেলি-ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতি বিস্তৃত পরিষেবা সরবরাহ করতে হচ্ছে। গ্রাহকের চাহিদার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে আদান-প্রদান বা ই-ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। উন্নত দেশের মতো দেশের ব্যাংকগুলোও শাখা-সংক্রান্ত বাধা তুলে দিয়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে গ্রাহকদের অভ্যস্ত করা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতকে আরও নিরাপদ, সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করতে ডিজিটাল ব্যাংকিং গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যে প্রযুক্তির নতুন বন্ধনের সংযোগ সৃষ্টি করেছে। আর এ ডিজিটাল বন্ধনই হয়ে উঠছে আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলার অন্যতম শক্তি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা