সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৪৮ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪০ পিএম
হাওরে এবার বর্ষা এসেছে একটু দেরিতে। আবার পানিও খুব বেশি আসেনি। তার পরও গত দুই মাস ধরে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার হাওরগুলো সেজেছে নবরূপে। অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে অগণিত ছুটে এসেছে ভ্রমণপিপাসু মানুষ। অবসাদ কাটাতে, আনন্দে ভাসতে, বাঁচার আস্বাদ নিতে মানুষ আসছে হাওরের ভাসমান অলওয়েদার সড়ক, ভাসমান ব্রিজ, বিভিন্ন প্রজাতির বন, দিগন্ত বিস্তীর্ণ জলরাশির কাছে। বিকালে হাওরের অবারিত নীল আকাশ আর সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার রক্তিম আবহ উপভোগ করার অন্যরকম প্রান্তর বিস্তীর্ণ হাওরের এই বিশাল জলরাশি।
বলে রাখা ভালো, এই সময়ে হাওর ভ্রমণ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সাঁতার না জানা মানুষ এবং হাওর সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তাদের জন্য এই জলাধার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভ্রমণে গিয়ে প্রতি বছরই একাধিক ভ্রমণকারী হাওরের পানিতে ডুবে মারা যান। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে হাওরে চলাফেরা করার সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।
শুকনো মৌসুমে হাওর মানে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ধুলোউড়া মেঠোপথ, রুপোলি নদী। কিন্তু বর্ষা এলেই তা হয়ে ওঠে অন্যরকম। প্রতি বর্ষাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঘুরতে আসেন কিশোরগঞ্জে। এবারও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে হাওর। দিন যত যাচ্ছে, তরুণ-তরুণীরা আরও বেশি হাওরপ্রেমী হয়ে উঠছে। তারুণ্যের জোয়ারে তরুণ ও সাধারণ মানুষ দল বেঁধে ছুটছেন এর সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে। জেলার হাওরের পাড়ে পাড়ে এখন ভ্রমণপিপাসুদের কলরব; যা নভেম্বর মাস পর্যন্ত চলবে। তারুণ্যের বাঁধভাঙ্গা ঢল আর উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা এই এলাকা এখন পর্যটনের এক বিশাল সম্ভাবনাময় স্বর্গপুরী।
হাওরের বেশ কয়েকটি স্থানে এবার পানির টানে ঢল নেমেছে দর্শনার্থীদের। এর মধ্যে রয়েছেÑ করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়াঘাট, বালিখলা ও হাসানপুর ব্রিজ, ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল-ওয়েদার সড়ক ও বেড়িবাঁধ, শিমুলবাঁকের হিজলবন, মিঠামইনের কামালপুরে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বাড়ি, দিল্লীর আখড়া, নিকলী বেড়িবাঁধ, ছাতিরচরের হিজলবন এবং তাড়াইলের হিজলজানি হাওর।
ভয়েজ অব হাওরের কর্ণধার অনুপম মাহমুদ বলেন, ‘বর্ষার শুরুতে জলমগ্ন হাওর এবং শেষের দিকে এখান থেকে পানি নিচে গড়িয়ে পরার দৃশ্য এ এলাকার রূপলাবণ্য আরও বাড়িয়ে দেয়। উপচে পড়া পানি ও নিম্নগামী পানি দুটিই দৃষ্টিনন্দন। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করুন এবং সন্ধ্যার আগেই নিরাপদ স্থানে ফিরে আসুন। এবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে অনেকেই বর্ষার এই শেষ সময়েও হাওর ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা হাওরবাসীর জন্য সুখবর। কারণ হাওরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হোটেল-রেস্তোরাঁ, নৌকাসহ নানা দোকানপাট ও যানবাহনে অসংখ্য মানুষের এ সময় কর্মসংস্থান ঘটে।’ এখানকার বিকাশমান পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার পথে নৌকাসহ বিভিন্ন যান সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি হাওরের অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সারা দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
নিকলী উপজেলা দামপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতি বর্ষার দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপিপাসু লোকজন বেড়িবাঁধে আসে। এবারও বর্ষার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিকলী বেড়িবাঁধে মানুষ আসছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসছে আড্ডা। প্রতিদিন নতুন উচ্ছ্বাস-আনন্দে ভাসছে বেড়িবাঁধ এলাকা।’
সরেজমিন দেখা গেছে, নিকলীর বেড়িবাঁধ যেন হয়ে উঠেছে সমুদ্র সৈকতের বিকল্প। এতে এ অঞ্চল পর্যটন স্পটের পরিচিতি পাচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে এ এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটার পাশাপাশি দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
হাওরের দ্বার হিসেবে সুপরিচিত চামড়াঘাট নৌবন্দর ও বালিখলা ঘাটে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ছুটে যান হাওরের বিশালত্ব। করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা ও হাসানপুর ব্রিজ এবার ভ্রমণের আনন্দে নতুনমাত্রা যোগ করেছে। বিশাল পিচঢালা সড়কের দুই ধারে হাজার হাজার জলযানের উপস্থিতি এক অপূর্ব দৃশ্যের সূচনা করেছে। কাকডাকা ভোর থেকে শত শত মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে বালিখলার সৌন্দর্য দেখতে ভীড় করছে। বিশেষ করে পানির ওপর নৌকায় বসে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অপার আনন্দে বিভোর ভ্রমণপিপাসুরা। হাসানপুর ব্রিজের চারিদিকে অথৈ জলরাশিতে হারিয়ে যাচ্ছে চোখ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী বলেন, ‘হাওর প্রতি বছর অপূর্ব সাজে সেজে দৃষ্টিনন্দন আবহ সৃষ্টি করে। তাই প্রতি বছরই এখানে মানুষের পদচারণা বাড়ছে। তবে হাওরের অথৈ পানিতে যারা সৌন্দর্য দেখতে চানÑতাদের অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।’
কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ইটনা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, ‘বর্ষার শুরুতেই হাওরের এসব স্থানে ভ্রমণপিপাসুদের হাট বসে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে হাওরের এসব স্পট। কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভ্রমণকারীদের এসব স্থানে যেতে হবে সাবধানে।’