প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১৩ পিএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২৩:৩২ পিএম
দক্ষিণ আফ্রিকার একটি খামার। কৃষকরা এখনও পুরো জমিতে লাঙল দেওয়া বা চষার উপর নির্ভর করেন। তবে তা মাটির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
মাটির গুণাগুণ জানতে এখনও বিজ্ঞানীদের অনেক জায়গায় গর্ত খুঁড়তে হয়। এই কাজটা খুবই সময়সাপেক্ষ এবং এতে মাটির আসল গঠনও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে নমুনার ফলাফলও অতটা নিখুঁত আসে না। তবে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার এক নতুন কৌশল দুর্ভিক্ষ আর খরা রুখতে দারুণ কাজে আসতে পারে—এমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা
এবার জোট বেঁধে ‘আর্থ রোভার প্রোগ্রাম’ নামের একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। তারা প্রথমবার
মাটি পরীক্ষা করার জন্য ‘সিসমোলজি’ বা ভূকম্পন বিজ্ঞান ব্যবহার করছেন। এই প্রযুক্তি
সাধারণত পৃথিবীর ভূত্বকের গভীরতা মাপা, ভূমিকম্প বোঝা বা মাটির নিচে তেল-গ্যাস খোঁজার
জন্য ব্যবহার করা হতো।
এই
গবেষক দলে রয়েছেন ভূতত্ত্ববিদ ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা। তারা এই নতুন কৌশলটির নাম দিয়েছেন
‘সয়েলসমোলজি’। তাদের লক্ষ্য হলো, সারা বিশ্বের মাটির সজীব অবস্থাটার নিখুঁত ম্যাপ তৈরি করে ফেলা। এটা করতে তারা মাটির ওপরে একটা ধাতব পাত রেখে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত
করেন এবং সেখান থেকে তৈরি হওয়া তরঙ্গ বা ঢেউগুলো মেপে নেন।
এই
তরঙ্গগুলো শক্ত জায়গা, যেমন-
পাথর বা চেপে যাওয়া মাটিতে ধাক্কা
খেয়ে ফিরে আসে। আবার, কেঁচো বা অণুজীবদের তৈরি করা গর্তের ভেতর দিয়েও চলাচল করে। এর
ফলে মাটির নিচে ঠিক কী হচ্ছে, তার একটা বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়।
মাটির শুষ্কতার কারণেও এই তরঙ্গ প্রভাবিত হয়, তাই মাটি কখন জল চাইছে, সেটা বোঝা যায়। মাটির ভেতরে অণুজীবের কতটা প্রাণ আছে, সেটাও জানা যায়। এতে কৃষকরা বুঝতে পারেন, কখন আরও জৈব সার দেওয়া দরকার।

আর্থ
রোভার প্রোগ্রাম নামের অলাভজনক উদ্যোগের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হলেন দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার
কলাম লেখক, প্রভাবশালী পরিবেশ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার জর্জ মনবিওট। তাদের উদ্দেশ্য হলো,
কৃষকদের জন্য একটি বিনামূল্যে অ্যাপ তৈরি করা। এই অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা নিজেদের মাটির
স্বাস্থ্য মাপতে পারবেন এবং তা উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শও পাবেন।
এই
উদ্যোগের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা, পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রফেসর সাইমন জেফারি বলেন, ‘মাটি আমাদের
সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর মধ্যে একটা। আমরা যে ক্যালোরি খাই তার ৯৯ শতাংশ আসে মাটি
থেকে; তা সরাসরি গাছ থেকে হোক কিংবা গাছ খাওয়া প্রাণির
মাংস থেকে। মাটির গুরুত্ব অনেকেই বোঝেন না, তাই এটা খুব অবহেলিত। কিন্তু মাটি না থাকলে
আমরাও থাকতাম না।’
জমিতে
লাঙল দেওয়া, কীটনাশক ব্যবহার, মাটির ক্ষয় আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার
মতো খারাপ চাষাবাদের অভ্যাসের ফলে আমরা খাদ্য উৎপাদনের জন্য যে মাটির ওপর নির্ভরশীল,
সেটাই আজ ক্ষতিগ্রস্ত। জনসংখ্যা বাড়ছে, তবে কিছু অঞ্চলে ফসল উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার
পূর্বাভাস রয়েছে।
মাটির
ভেতরের সমস্যাগুলো নিখুঁতভাবে জানতে না পারায় কৃষকদের পক্ষে তার সমাধান করা কঠিন হয়ে
যায়। একই জমিতে হয়তো এক মিটার দূরেই ফলনের তারতম্য দেখা যায়। এর কারণ হলো- মাটির এমন
কিছু বৈশিষ্ট্য, যা উপর থেকে বোঝা যায় না। তাই কৃষকরা বাধ্য হয়ে পুরো জমিতেই সার দেন
বা লাঙল চালান। এটা পরিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য ও নদী দূষণের জন্য ক্ষতিকর, আর খরচও বেশি।
কেনিয়ার
মৃত্তিকা বিজ্ঞানী পিটার মোসোঙ্গো বলেন, এই প্রযুক্তি তার অঞ্চলের কৃষকদের জীবন বদলে
দিতে পারে। ‘আমরা মাউন্ট কেনিয়ার কাছে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানকার একজন কৃষক
আমাদের বললেন, তিনি কখনও তার জমিতে মাটি পরীক্ষা করাননি। তারা জানেন পরীক্ষা দরকার,
কিন্তু পরীক্ষাগারগুলো অনেক দূরে। গরিব কৃষকদের সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। আমাদের
প্রযুক্তি মাটির গভীরে থাকা চাপা চাপা জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে পারে। এর ফলে বন্যার
ঝুঁকি কমে ও ফলন বাড়ে।’
মোসোঙ্গো আরও বলেন, ‘যদি আমরা মাটির উর্বরতার সমস্যা মেটাতে পারি, তবে খাদ্য সংকটও মোকাবিলা করতে পারব। আমরা কৃষকদের তাদের মাটির সমস্যাগুলো বলে দিতে পারি। তখন তারা জৈব সার দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নিয়ে ফলন বাড়াতে পারবে।’

ভূকম্পন
তরঙ্গ ব্যবহার করার এই পদ্ধতির কারণে এখন থেকে প্রতিদিনকার কাজে আর অত গর্ত খুঁড়তে
হবে না বলে উল্লেখ করেন মোসোঙ্গো আর জেফারি।
জেফারি
হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমার আর মোসোঙ্গোকে আমাদের জীবনে অনেক বেশি গর্ত খুঁড়তে হয়েছে!’
জেফারি
আরও জানান, মাটির ওপর গবেষণা খুব কম হয়েছে। যুক্তরাজ্যে ছোট আর খুব ভালোভাবে স্টাডি
করা হলেও সেখানের সেরা মাটির চিত্রটির নির্ভুলতাও ৫ কিমি গুণ ৫ কিমি গ্রিডের। কিন্তু
একটা ক্ষেতের মধ্যেই মাটির ধরন, উর্বরতা আর চাপের যে পার্থক্য থাকে, তা জানার জন্য
এই চিত্রটি যথেষ্ট নয়।
জেফেরি
বলেন, ‘আমি যেখানে কাজ করি, হারপার অ্যাডামস বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানকার মাটির যে চিত্র
(ম্যাপ) আছে, সেখানে বলা আছে মাত্র তিন ধরনের মাটি আছে এবং কোনও জৈব মাটি (পিট) নেই।
কিন্তু আমরা এই নতুন কৌশলে ১৮ ধরনের মাটি আর বেশ অনেকটা জৈব মাটি খুঁজে পেয়েছি।’
মোসোঙ্গো
জানালেন, আফ্রিকার দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানকার মাটির ম্যাপ ‘মাত্র কয়েকটি
নমুনার ওপর নির্ভর করে তৈরি করা’, যার ফলে কৃষকরা উর্বরতার সমস্যাগুলো মেটাতে পারেননি।
তিনি
বলেন, ‘বর্ষার সময় আমাদের সমস্যা হয়। জল নিচের স্তরে ঢুকতে পারে না, তাই প্রচুর বন্যা
হয়। গাছগুলোও বাঁচতে পারে না, কারণ শিকড় গভীরে যেতে পারে না।’
মাটিকে
ক্ষয় আর নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা জরুরি জানিয়ে মোসোঙ্গো বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে ১ সেন্টিমিটার
মাটি তৈরি হতে প্রায় ৫০০ বছর লাগতে পারে। সেই মাটি এক বিকেলেই ভেসে যেতে পারে। সেটা
পলি হিসেবে নদীতে মেশে আর সমুদ্রের দিকে ভেসে যায়; আমরা
আর সেটাকে ফিরে পাই না। মাটি ফুরিয়ে গেলে, আমাদের খাবারও ফুরিয়ে যাবে।’
সয়েলসমোলজি
পদ্ধতি ব্যবহার করে মাটির কার্বনের পরিমাণও মাপা যায়, কারণ এখন এই হিসাবটা বেশিরভাগই
আন্দাজের ওপর চলে।
সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা আশা করছেন- তাদের এই প্রযুক্তি বিশ্বকে খাদ্য জোগাতে কৃষকদের
সাহায্য করতে পারবে।
মোসোঙ্গোর
সতর্কবার্তা, ‘জনসংখ্যা বাড়ছে, অথচ আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়ছে না, বরং কমছে। আমরা কিছু
না করলে, আমাদের সামনে ভয়াবহ অনাহার অপেক্ষা করছে।’
ইউকে
সেন্টার ফর ইকোলজি অ্যান্ড হাইড্রোলজির পরিবেশ বিজ্ঞানী এইডান কিথ (যিনি এই প্রজেক্টের
সঙ্গে যুক্ত নন) বলেন, ‘মাটি একটা বেশ জটিল মাধ্যম, যেখানে তরঙ্গের সংকেত শুনতে ও ধরতে
হয়। ভূকম্পন তরঙ্গ ব্যবহার করে মাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভৌত গুণাবলী জানার জন্য
উন্নত অথচ সস্তা সেন্সর প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্য ডেটা বিশ্লেষণের যে উন্নয়ন হচ্ছে,
তা যুগান্তকারী হতে পারে।’
‘সীমিত ক্ষতি করে সহজে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। ফলে এর প্রচুর সম্ভাবনা আছে। তবে, এর বর্তমান সীমাবদ্ধতা ও সর্বোচ্চ কার্যকারিতা সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। দেখা যাওয়া ডেটার আরও গভীর অর্থ বোঝার জন্য বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা খুব জরুরি’ যোগ করেন তিনি।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান