রহমতের সপ্তম দিন আজ
মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৪ এএম
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২০ এএম
হজরত মুহাম্মদহ (সা.) রমজান উপলক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ খুতবা প্রদান করেছিলেন। যা পবিত্র রমজান মাসের পরিচয়, দর্শন ও উদ্দেশ্যের এক অনুপম দলিল। এই হাদিসে রমজানকে কেবল উপবাসের মাস হিসেবে নয় বরং আত্মশুদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক সহমর্মিতা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণকাল হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন।
নবী কারিম (সা.) তার খুতবার শুরুতেই মানবজাতিকে সম্বোধন করে ঘোষণা
করেন, ‘এক মহান ও বরকতময় মাস তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করতে যাচ্ছে। এই মাসের বিশেষত্ব
হলো, এতে এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম, লাইলাতুল কদর। আর এ মাসে একটি
ফরজ আদায় করলে তার সওয়াব হয় অন্য সময়ের সত্তরটি ফরজের সমান।’ এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়,
রমজান হলো আমলের গুণগত মান বাড়ানোর মাস, যেখানে নিয়ত ও চেষ্টা বহুগুণে ফলপ্রসূ হয়।
ভাষণে তিনি এ মাসকে ‘শাহরুল মুওয়াসাত’ সহমর্মিতার মাস হিসেবে অভিহিত করেন। বস্তুত রোজা
মানুষকে অভাবী ও ক্ষুধার্ত লোকদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। ফলে সমাজে দয়া, দান ও সহযোগিতার
চর্চা বৃদ্ধি পায়।
ভাষণে নবীজি (সা.) রোজাদারকে ইফতার করানোর ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান
করেন। এটা ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একজন রোজাদারকে খেজুর, এক
ঢোক পানি বা সামান্য দুধ দিয়েও ইফতার করালে আল্লাহতায়ালা রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব
দান করেন এবং তা রোজাদারের সওয়াব কমানো ছাড়াই। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে নিয়ত ও আন্তরিকতার
মূল্য বস্তুগত পরিমাণের চেয়েও অনেক বেশি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনস্থদের কাজ
সহজ করে দেয়, আল্লাহতায়ালা তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ এটি ইসলামের
শ্রমনীতি ও মানবিক ব্যবস্থার এক গভীর নির্দেশনা, যেখানে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে দয়া
ও সহানুভূতির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। সবশেষে নবী কারিম (সা.) চারটি আমলের কথা উল্লেখ করেছেন,
যা রমজানে বেশি বেশি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি হলোÑ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার
জন্য কালেমা শাহাদাত ও ইস্তিগফার। আর দুটি এমন, যা ছাড়া মানুষের মুক্তি অসম্ভব, জান্নাত
প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া। এ চারটি আমল মূলত ঈমান, তাওবা, আশা
ও ভয়ের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, বর্ণিত হাদিসের সারকথা হলোÑ রমজান কেবল
উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মসংযম, ইবাদত, সামাজিক দায়িত্ব, মানবিকতা ও আল্লাহমুখী জীবনের
এক পূর্ণাঙ্গ পাঠশালা। যে ব্যক্তি এ মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার জন্য রমজান
হয়ে ওঠে গুনাহমুক্ত জীবন ও চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। এই হাদিস রোজার প্রকৃত তাৎপর্য
ও আত্মিক দর্শনকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছে। আজকের সমাজে রোজাকে অনেকেই একটি
আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় বর্জন করা হচ্ছে, অথচ মুখে মিথ্যা, জিহ্বায়
কটু বাক্য, চোখে অন্যায় দৃষ্টি, হাতে দুর্নীতি এবং আচরণে জুলুমÑ সবই বহাল থাকছে। এই
দ্বৈত আচরণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে আত্মপ্রবঞ্চনা। হাদিসটি আমাদের সেই ভ্রান্ত ধারণা থেকে
বের করে এনে জানিয়ে দেয়, নৈতিকতা ও সত্যবাদিতা ছাড়া রোজা অর্থহীন। রোজা হোক আত্মশুদ্ধির
এক বিপ্লব। মিথ্যা ও অন্যায় বর্জনের দৃঢ় অঙ্গীকার হোক এর প্রথম শর্ত। তাহলেই রোজা আমাদের
সত্যিকারার্থে আল্লাহভীরু, নৈতিক ও মানবিক মানুষে পরিণত করবে।