মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম
সংযম অনুশীলনের মাস রমজান। এ সংযমের মাসেও মানুষ নানাবিধ পাপে জড়িয়ে যায়। আসলে রোজাদারদের সংযমকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য শয়তান প্ররোচনা দিয়ে থাকে প্রতিনিয়ত। এজন্যই প্রতিবছর রমজান আসে, রমজান যায়; কিন্তু আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই থেকে যাই। রোজাদারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কোনো চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না।
ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, রমজান আসে মানুষকে একটি মাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রূপান্তর করতে। ক্রমাগত একটি মাস তাকওয়ার অনুশীলনে প্রতিটি প্রাণকে উজ্জীবিত করা হয়। এর লক্ষ্য সারা পৃথিবী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে তাকওয়ার বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিফলন দেখবে। কিন্তু আমাদের অসহিষ্ণুতায় সবকিছু ভেস্তে যায়।
সংযমের প্রতিশব্দ হচ্ছেÑ নিয়ন্ত্রণ, দমন, রোধ, নিরোধ, সংবরণ, প্রশমন, নিবারণ, নিবৃত্ত, বশীভূত প্রভৃতি। সে অর্থে রমজান আমাদের শিক্ষা দেয়, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিজের নফসকে বশীভূত করা, জেদ ও হিংসাকে দমন করা, রাগ সংবরণ করা বা প্রশমন করা। বাক্য, ভাষা ও ইন্দ্রিয় সংযমও রমজানের শিক্ষা।
কিন্তু এই মাসটিকে নিরঙ্কুশ সংযমের মাস বলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাজার পরিস্থিতি। ব্যবসায়ীদের অনেকেই দুনিয়ার স্বার্থ, স্বাদ ও আরাম-আয়েশের কারণে রমজানকে এক বিরাট সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। দু’হাতে মুনাফা লোটার জন্য রমজানে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুণ্ঠনের জন্য কালোবাজারি ও খাদ্যে ভেজাল মিশ্রিত করেন। প্রবৃত্তির লালসার মোকাবিলা করার পরিবর্তে এরা তার সামনে নতজানু হয়।
সামান্য পার্থিব লোভ-লালসার জন্য আল্লাহর দেওয়া অপার রহমতের সুযোগ-সুবিধাকে পরিত্যাগ করে দুনিয়ার লালসাকে চরিতার্থ করার জন্য সম্মানিত রোজাদারদের কষ্ট দেয়। এ ধরনের লোভী-লালসার অধিকারী ব্যক্তিদের আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত ঘৃণিত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
সংযমের আরও দুটি প্রতিশব্দ হলোÑ মিতাচার ও পরিমিতি। সারা রমজানে ইফতারের আয়োজন থেকে শুরু করে ঈদের কেনাকাটায় আমাদের দেশের কোথাও সংযম, মিতাচার ও পরিমিতি আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। অথচ এ মাসে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-খয়রাত করার কথা ছিল।
সহিহ বোখারিতে আছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) সর্বাপেক্ষা বেশি দানশীল ছিলেন। তার দানের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি হতো। আল্লাহ দানের প্রতিদান ৭০০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই মাসটি হতে পারে তা চর্চা করার। আমরা বেশি বেশি দান করে অসচ্ছলদের কষ্ট লাঘব করতে পারি। দানের জন্য এর চেয়ে উত্তম মৌসুম আর কোনটি হতে পারে? এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের জন্য, গরিব-দুঃখী, এতিম ও অসহায় মানবতার জন্য খরচ করা হবে। রমজান সমাপ্তির পরপরই আসে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে খুশির ঈদ। এই ঈদকে ধনী-গরিব সব মুসলমানের ঘরে পৌঁছে দেওয়ায় জাকাত বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ মাসে জাকাতের সম্পূর্ণ টাকা আদায় করার জন্য বিশেষ তাগিদ করা হয়েছে।
সংযমের বৈশিষ্ট্য হলোÑ মিতব্যয়ী ও পরিমিত ব্যয় করা; কিন্তু অপচয় করা যাবে না। এটি শয়তানের প্ররোচনায় হয়ে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘...অপব্যয় করো না। নিশ্চই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ Ñসূরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘...আর খাও ও পান করো; কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না, আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।’ Ñসূরা আরাফ: ৩১
হালালকে হারাম, হারামকে হালাল করার মাধ্যমে তার নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করা আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেন না।