শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:২০ পিএম
প্রতীকী ছবি
রাগ-ক্রোধ মানুষের স্বভাবের অপরিহার্য বিষয়। মানুষের স্বভাব মূলত আল্লাহতায়ালাই সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রত্যেকের স্বভাবের মধ্যে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। কিন্তু স্বভাবগত দিক থেকে রাগ-ক্রোধ অমঙ্গল ডেকে আনে। যেকোনো কাজে রাগের বহিঃপ্রকাশ থাকলে কাজটিতে সুফলের চেয়ে কুফলের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই আমাদের উচিত রাগের মতো ক্ষতিকর স্বভাব পরিহারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রাগ হলো মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে একটি। যদি এটিকে সামনে রেখে দেওয়া হয়, কখনও কখনও এটি উন্মাদনা আকারে প্রকাশ পায় এবং স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে অনেক বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত এবং অপরাধ করে, যার জন্য তাকে আজীবন প্রায়শ্চিত্ত ও আফসোস করতে হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ভালো মানুষের একটি বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘তারা যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা এত মহৎ হয় যে তারা ক্ষমা করে দেয়, যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কার্য থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে।’ -সূরা শুয়ারা: ৩৭
অন্য কথায়, যখন তাদের ভেতরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে তখন তারা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সব ধরনের নোংরা পাপ ও অপরাধে লিপ্ত হয় না। বড় পাপ ও কুৎসিত কাজ এড়িয়ে চলার বিষয়টির পর এই গুণের কথা উল্লেখ করা সম্ভবত এই কারণে যে, অনেক পাপের উৎস হলোÑ রাগের অবস্থা, যা যুক্তির হাত থেকে আত্মার লাগাম ছেড়ে দিয়ে সব দিকে স্বাধীনভাবে ছুটে চলে। চিন্তার বিষয় হলো, আয়াতে বলা হয়নিÑ ‘তারা রাগ করে না।’ কারণ রাগ প্রতিটি মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি। যখন কঠিন পরিস্থিতি দেখা দেয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো যে তারা তাদের রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং কখনোই রাগের আধিপত্যে পড়ে না, কারণ রাগ সব সময় নেতিবাচক এবং ধ্বংসাত্মক হয় না।
রাগ-ক্রোধ যদিও মহান আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, তবু এটা নিয়ন্ত্রণ করা ও নিজেকে সংবরণ করার মধ্যে আল্লাহতায়ালা প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন। রাগ নিয়ন্ত্রণকারীকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফল ও শক্তিশালী বলেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা রাগ নিয়ন্ত্রণকারীকে ‘মুহসিন’ বান্দাদের মধ্যে গণ্য করেছেন। মুহসিন বান্দা বলতে সৎকর্মশীল, উপকারী, দানশীল ও আল্লাহর ইবাদতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী বান্দাকে বোঝানো হয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাগ সংবরণকারী ও মানুষকে ক্ষমাকারী আর মহান আল্লাহ মুহসিন বান্দাদের ভালোবাসেন।’ -সূরা আলে-ইমরান: ১৩৪
হজরত হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান (রহ.) বলেছেন, একজন সাহাবি নবী কারিম (সা.)-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে উপদেশ দিন। নবীজি (সা.) জবাবে বলেন, ‘রাগ করও না।’ অর্থাৎ রাগ করার স্বভাব বর্জন করও। সাহাবি বলেন, অতঃপর চিন্তা করতে লাগলাম, এমন উপদেশ আমাকে কেন দিলেন, পরে বুঝতে পারলাম বহু মন্দ কাজ রাগের মধ্যে আছে।’ -মুসনাদে আহমদ : ৫/৩৭৩
নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই রাগ শয়তানের প্ররোচনায় আসে, শয়তান হচ্ছে আগুনের তৈরি আর আগুন পানি দিয়ে নির্বাপিত হয়। তাই যখন তোমাদের কাউকে রাগান্বিত করা হয় তখন সে যেন অজু করে নেয়।’ -সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৮৪
দুনিয়াতে বহু অনিষ্টের কারণ হলো রাগ। মানুষ রাগের বশবর্তী হয়ে অনেক নির্দয় ও অত্যাচারমূলক কাজ করে ফেলে। এ রাগের ফলে মানুষ সম্মানিত হওয়ার পরিবর্তে লজ্জা ও অবজ্ঞার শিকার হয়। তাই কারও দ্বারা কোনো ক্ষতি বা অন্যায়মূলক কাজ হয়ে গেলেও রাগ না করে ক্ষমা করা কিংবা ধৈর্য ধারণ করা উচিত। কারণ রাগ নয় ক্ষমায় রয়েছে মুমিনের সাফল্য। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাগ নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমা প্রদর্শনে রয়েছে ইসলামের অনেক নির্দেশনা। এ কাজের বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে রাগ প্রতিফলনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও নিজের রাগ সংবরণ করে, আল্লাহতায়ালা তার অন্তর ঈমান নিরাপত্তা দিয়ে পূর্ণ করে দেন।’ -সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৭৮