শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজে একে অন্যের প্রয়োজন পড়ে। এটা আল্লাহতায়ালার দেওয়া এক অশেষ নিয়ামত। কেননা সমাজবদ্ধতার প্রশ্নে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সঠিকভাবে যথার্থ বন্ধু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিকাশ ঘটায়। এমন বন্ধুত্বের বিষয়ে রয়েছে ইসলামের বিশেষ নির্দেশনা।
ইসলাম মনে করে, ভালো বন্ধুত্বের প্রভাব অন্য বন্ধুর জীবনেও প্রতিফলিত হয়। বলা হয়, ‘একাকী নিঃসঙ্গতার চেয়ে ভালো বন্ধু উত্তম আর নিঃসঙ্গতা মন্দ বন্ধুর চেয়ে উত্তম।’ তার মানে হলো, ভালো বন্ধু যদি নাও থাকে সেটা মন্দ ও অযোগ্য বন্ধু থাকার চেয়ে ভালো। তাই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত। কারও প্রতি মন আকৃষ্ট হলেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে এমনটা ঠিক নয়। বরং প্রথমে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে, তার প্রতি আকর্ষণের কারণ কিংবা উৎস কী; সে আদৌ বন্ধু হওয়ার যোগ্য কি না ইত্যাদি।
ইসলামী চিন্তাবিদদের অভিমত, ‘যে ব্যক্তি চিন্তাভাবনা করে যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ করে বন্ধু নির্বাচন করবেÑ তাদের বন্ধুত্ব বজায় থাকবে এবং তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হবে।’ হঠাৎ করে কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অর্থাৎ কোনোরকম বাছ-বিচার ছাড়া বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে অনেক সময় দুঃখজনক পরিণতি ঘটতে পারে। ইন্টারনেটে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এখনকার সময়ে অনেকে বন্ধুত্বের পাল্লায় পরে মাদকাসক্ত হচ্ছে, কেউ জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসে। অনেক সময় খুন, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের মতো কাজেও জড়িয়ে পড়ছে শুধু বন্ধুত্বের টানে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নৈতিক উপযুক্ততা ভালো বন্ধুর অন্য একটি গুণ। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ভালো বন্ধু সেই হতে পারে যে নৈতিক স্খলন থেকে দূরে থাকে। কেননা দুশ্চরিত্রবান আর মন্দ কাজে অভ্যস্ত বন্ধু শেষ পর্যন্ত মানুষকে অবৈধ, অশোভন আর অনৈতিক কাজের দিকে নিয়ে যায়। কুরআনে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে বিচ্যুত এবং ফাসেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সে আসলে নিজের ওপর নিজেই জুলুম করে।’ কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থা সম্পর্কে কুরআন বলছে, ‘হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।’
ইসলামের দৃষ্টিতে ভালো বন্ধুর বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক হলোÑ বন্ধুত্বের বন্ধন রক্ষা করা, সততা রক্ষা করা এবং বন্ধুকে সম্মান করা। কারণ বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তার ফলে একজনের প্রতি আরেকজনের একটা অধিকার সৃষ্টি হয়, আর সেই অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো অবশ্য কর্তব্য। সর্বোপরি একজন মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব হলোÑ অন্যের সম্মান রক্ষা করা। চাই তা নীতিকৌশল পরিবর্তনের ব্যাপারেই হোক কিংবা ব্যক্তির আচার-আচরণে সংস্কার আনার বিষয়ে হোক, অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। বন্ধুত্বের নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হচ্ছে অসুখ-বিসুখ ও বিপদ-আপদে বন্ধুত্ব অটুট রাখা। যেমনটি মহাকবি শেখ সাদি বলেছেন, ‘বন্ধু হলো সেই, যে বন্ধুর হাত ধরে মানসিক অস্থিরতা আর চরম দুরবস্থায়।’ আর লোকমান হাকিম বলেছেন, ‘প্রয়োজনের মুহূর্ত ছাড়া বন্ধুকে চেনা যায় না।’
ইসলাম মনে করে বন্ধুদের সঙ্গে আচরণ হতে হবে সদয়, আন্তরিক এবং বিনয়ী। তবে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধুত্বের মাঝে বিদ্যমান অনিবার্য একটি শিষ্টাচার। হাদিসে এসেছে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য আয়নার মতো।’ তাই বন্ধুর দোষ-ত্রুটি শোধরানোর বিষয়ে সহযোগিতা করা জরুরি। সুতরাং, এ কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা যেতে পারে, উত্তম গুণের অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করা প্রতিটি মুসলমানের কাম্য। যদিও নানা কারণে প্রকৃত বন্ধু চেনা খুবই কঠিন। অনেক সময় চরম শত্রুও বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে এসে ভীষণ সর্বনাশ করে।