হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২০ এএম
ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে আজ শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আয়োজন। শনিবার সারা দেশের মন্দিরে মন্দিরে পঞ্চমীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন শেষে তিথি অনুযায়ী আজ মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হবে। অশুভকে দমন করে শুভের আলিঙ্গনে মানবতার দিকে অগ্রসর হওয়ার মহামন্ত্র সঙ্গে এবার দেবী আসছেন গজে (হাতি) চেপে এবং যাবেন দোলায় (পালকি) চেপে। ভক্তি, নিষ্ঠা, পূজার আনুষ্ঠানিকতা আর ভক্তের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে জাগরিত হবে বিশ্ব থেকে অশুভকে বিদায় দেওয়ার পণ।
সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকা মতে, গজে চেপে দেবীর আগমন মানেÑ শস্য-শ্যামলা বসুন্ধরা। অর্থাৎ দেবীর আগমনকালে চারদিকে ফুলে ফলে ভরে থাকার বার্তা রয়েছে। শাস্ত্রমতেÑ গজে দেবীর আগমনকে শুভ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে দেবীর গমন দোলায় বা পালকিতে। মনে করা হয়Ñ দেবীর গমন দোলায় হলে তা মড়কের বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের বার্তা দেয়। যার ইঙ্গিত মোটেও শুভ নয়। তবু দেবী দুর্গার আগমনে এখন উচ্ছ্বসিত ভক্তকুল। বাঙালির হৃদয়ে শরৎকালের দুর্গার অধিষ্ঠান কন্যারূপে। প্রতি বছর বিভিন্ন বাহনে সপরিবারে শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী মর্ত্যলোকে বাপের বাড়িতে আসেন। তাই দেবীকে বরণে আয়োজনের কমতি নেই। সারা দেশে চলছে উৎসবের আমেজ। ইতোমধ্যেই সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে ৫ দিনব্যাপী পূজার সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
গতকাল এক শুভেচ্ছা বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার যে অগ্রযাত্রা আমরা শুরু করেছি, তার সফল বাস্তবায়নে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সকল অশুভ, অন্যায় আর অন্ধকারকে পরাজিত করে শুভ চেতনার জয় হবে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথেÑ দুর্গাপূজা উপলক্ষে সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি।’
সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের অপূর্ব মেলবন্ধনের অনন্য নিদর্শন বাংলাদেশ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই ধারাকে সমুন্নত রেখে এবারের দুর্গাপূজাও সারা দেশে নির্বিঘ্নে এবং যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৯টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ঢাকা মহানগরে ২৫২টি পূজার আয়োজন হয়েছিল। সে হিসেবে মহানগরে পূজা বেড়েছে ৭টি। সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর আয়োজন করা হয়েছিল, ৩১ হাজার ৪৬১টি পূজার।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও দায়িত্ব পালন করবে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন সেনাপ্রধান। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।’
সরেজমিন ঘুরে গতকাল শনিবার দেখা যায়, রাজধানীর মন্দিরে মন্দিরে চলছে দেবী প্রতিমার রঙ করার কাজ। কাদামাটির প্রলেপের ওপর রঙ-তুলির আঁচড়ে দশভুজা দেবী ষষ্ঠীতে পাবেন জীবন্ত রূপ। দেবী সেজে উঠবেন অপরূপ সাজে। শঙ্খ, উলুধ্বনি আর মঙ্গল সংগীতে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেবেন সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তরা। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে রাজধানীর পূজামণ্ডপগুলো সাজাতে রঙ-বেরঙের ফেস্টুন, ব্যানার আর বর্ণিল তোরণ নির্মাণে পূজা কমিটির সদস্যদের ব্যস্ততারও কমতি নেই। আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে নানা আয়োজন সম্পন্নের কাজ চলছে।
প্রসঙ্গত মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে গত ২১ সেপ্টেম্বর। আগামীকাল সোমবার মহাসপ্তমী, মঙ্গলবার মহাঅষ্টমী, বুধবার মহানবমী ও বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) বিজয়া দশমী পূজা। দশমীর দিনে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের।