শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:১১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
অন্যায় আচরণ সর্বদা নিন্দনীয়। মানুষের সঙ্গে অন্যায় নানাভাবে হতে পারে। মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা, শারীরিক আঘাত, গালি দেওয়া, তাদের ওপর বাড়াবাড়ি করা, দুর্বলদের ওপর চড়াও হওয়া এবং মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়Ñ এমন কাজ করা অন্যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অত্যাচারীরা শিগগির জানবে তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়।’ -সূরা আশ-শুয়ারা: ২২৭
হাদিসে নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জুলুম করা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জুলুম কেয়ামতের দিন গভীর অন্ধকারে পরিণত হবে।’ -সহিহ মুসলিম: ৪৬৭৫
দয়াময় আল্লাহতায়ালা জুলুম অপছন্দ করেন। তিনি কারও প্রতি জুলুম করেন না এবং জুলুমকারীকে ভালোবাসেন না। তাই তিনি বান্দার ওপর এই জুলুমকে হারাম ঘোষণা করেছেন। হজরত আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তার মহিমান্বিত পরওয়ারদিগার ইরশাদ করেন, ‘আমি আমার নিজের ওপর ও বান্দাদের ওপর অত্যাচারকে হারাম করে নিয়েছি। অতএব, তোমরা পরস্পর পরস্পরকে অত্যাচার কর না।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৪৬৯
এক কথায়Ñ কারও প্রতি জুলুম করা, অত্যাচার করা, এসব খারাপ কাজ, অন্যায়Ñ এটা আমরা সবাই জানি। এই জুলুমকে নির্ধারিত কয়েকটি অর্থেই বুঝি। অথচ সমাজে প্রচলিত এমন অনেক জুলুম রয়েছে, যেগুলোকে আমরা জুলুমই মনে করি না বা একেবারে মামুলি বিষয় মনে করি। এর চেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, জুলুমকে মন্দ মনে করলেও অত্যাচারীর সহযোগী-সমর্থককে সে অর্থে মন্দ মনে করি না।
কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা করার ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও মানদণ্ড রয়েছে। যে কেউ কোনো কাজের সমর্থন চাইলেই বা যে কারও কোনো কাজ নিজের মনমতো হলেই নির্দ্বিধায় তার সঙ্গে সহমত পোষণ ও সহযোগিতা করা যায় না। কারণ, কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্য হলো, সমর্থনকারীর ওপরেও কাজের দায় বর্তাবে। সহযোগিতাকারীও সওয়াব ও গুনাহের ভাগিদার হবে। কাজেই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য অন্যের কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত কাজে সহযোগিতা করা। যেন অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে গিয়ে শরিয়ত লঙ্ঘন করা না হয়। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরের সহযোগিতা কর। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা কর না। আল্লাহকে ভয় করে চল। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।’ -সূরা মায়েদা : ২
বর্ণিত আয়াতের শিক্ষা হলো, কোনো বিষয়ে অন্যকে সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য শর্ত হলো, যে বিষয়ে আমি সহযোগিতা করছি, তা নেক কাজ ও তাকওয়ার বিষয় হতে হবে। জালেমের পক্ষাবলম্বন করা ও সমর্থন করা বড় অন্যায় ও গুনাহের কাজ। শরিয়তের নির্দেশনা হলো, জালেমকে যথাসম্ভব জুলুম থেকে বাধা দেওয়া। কমপক্ষে অন্তর থেকে ঘৃণা করা। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জালেমদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকেও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো রকমের বন্ধু লাভ হবে না। আর তখন কেউ তোমাদের সাহায্য করবে না।’ -সূরা হূদ: ১১৩
এ আয়াতের মধ্যে সেসব লোকের জন্য বড় শিক্ষার উপকরণ রয়েছে, যারা জালেমদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যায় সমর্থন দিয়েছেন। এখানে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির ধমকি দিয়েছেন।
বর্ণিত আয়াতের শিক্ষা হলোÑ জালেমের জুলুম ও অন্যায়-অবিচারকে পছন্দ করা ও তার প্রতি অন্যায় পক্ষপাত লালন করা যাবে না। প্রতিবাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জালেমের জুলুমের প্রতিবাদ না করা; বরং এর ওপর মৌনতা অবলম্বন করা পাপ। জালেমের সংশ্রব ও তার ব্যাপারে নমনীয়তা অবলম্বন করা বৈধ নয়। বাহ্যিক বেশভূষা ও জীবনাচারে জালেমের অনুসরণ করা গোনাহ। এ আয়াতে জালেমের সঙ্গে শুধু সখ্য ও সম্পর্ককেই নিষেধ করা হয়নি; বরং জালেমের ব্যাপারে সামান্যতম শিথিলতাকেও নিষেধ করা হয়েছে। -তাফসিরে কুরতুবি: ৯/৭২
শেষ কথা হলো, যারা জালেমকে জুলুমের কাজে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন করেছে তাদের উচিত, নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করা, মজলুমের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং হক ফিরিয়ে দেওয়া। অন্যথায় তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে দুনিয়া-আখিরাতের লাঞ্ছনাকর শাস্তি।