পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)
শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৪ এএম
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৩ পিএম
পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন হিসাব মতে, বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি রহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদুল মুরসালিন খাতামুন্নাবিয়ীন তাজদারে মদিনা জগৎকুল শিরোমণি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। আজ থেকে ১৪৫৫ বছর আগে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়ালের সুবহে সাদেকের সময় মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশে মা আমেনার গর্ভে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তিনি পিতৃহারা হন এবং জন্মের অল্পকাল পরই বঞ্চিত হন মাতৃস্নেহ থেকেও। অনেক দুঃখ, কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠেন। চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর তিনি সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নবুয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। অসভ্য বর্বর ও পথহারা জাতিকে সত্যের সংবাদ দিতে তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন আল্লাহতায়ালার তাওহিদের বাণী। কিন্তু অসভ্য মূর্খ জাতি দাওয়াত গ্রহণ না করে তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভিন্নমুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে একের পর এক। কিন্তু তিনি আল্লাহতায়ালার সাহায্যের ওপর ভরসা করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যান। ধীরে ধীরে সত্যান্বেষী মানুষ তার সঙ্গী হতে থাকে।
অন্যদিকে মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্রও প্রবল আকার ধারণ করে। এমনই একপর্যায়ে তারা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন এবং মদিনা সনদ নামে একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। মদিনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান নামে খ্যাত। এ সংবিধানে ইহুদি-খ্রিস্টান-মুসলমানসহ সবার অধিকার স্বীকৃত হয় যথাযথভাবে।
এদিকে মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় লেবাসধারী মুনাফিক চক্র। এরা ইসলামের চরম ক্ষতিসাধনে লিপ্ত হয় মহানবী হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে ওহুদ যুদ্ধে এক হাজার মুসলিম সৈন্য রওনা করলে পথিমধ্যে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর নেতৃত্বে ৩০০ জন সরে পড়ে এবং ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যয় ঘটানোর অপচেষ্টা চালায়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক সাহাবা শহীদ হন। স্বয়ং হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁত মোবারক শহীদ হয়। ২৩ বছর শ্রম সাধনায় অবশেষে রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে।
অতঃপর বিদায় হজের ভাষণে তিনি আল্লাহর বাণী শোনান মানবজাতিকে। বলেন, ‘আজ থেকে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হলো। তোমাদের জন্য দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা হিসেবে একমাত্র ইসলামকে মনোনীত করা হয়েছে।’
বস্তুত আল্লাহতায়ালা বিশ্বজগতের রহমতস্বরূপ হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। তার আবির্ভাবে পৃথিবীতে মানুষ ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জগতের মুক্তির সন্ধান পায় এবং নিজেদের কল্যাণ শান্তির নিশ্চয়তা লাভ করে। সমাজে বিদ্যমান শত অনাচার ও কদর্যতার গ্লানি উপেক্ষা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল অনুসরণীয় আদর্শ। নিজ যোগ্যতা, সততা, মহানুভবতা, সহনশীলতা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মপ্রত্যয়, অসীম সাহস, ধৈর্য, সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, নিষ্ঠা, অপরিসীম দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে তার ওপর অবতীর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগ্রন্থ কুরআনে কারিমের বাণী তথা তাওহিদ প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগ দূর করে অত্যাচার, নির্যাতন বরণ করে সত্য ও ন্যায়কে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের সেবা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, পরমতসহিষ্ণুতা, দয়া ও ক্ষমাগুণ, শিশুদের প্রতি দায়িত্ব এবং নারী জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবীর আদর্শ অতুলনীয় এবং তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে অভিষিক্ত।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি জানাই ভালোবাসাদীপ্ত অসংখ্য দরুদ ও সালাম। সেই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, জীবনের সর্বক্ষেত্রে রাসুলের অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করার। এটাই হোক এবারের ১২ রবিউল আউয়ালের শপথ।
ধর্মীয় গবেষক ও আলেম