প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৫ এএম
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৭:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আজ বুধবার। লোকনাথ পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ ৯ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১০ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১১ অক্টোবর মহাষ্টমী ও ১২ অক্টোবর মহানবমী এবং ১৩ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে শারদীয় দুর্গোৎসবের। এ বছর ঢাকা মহানগরে ২৫২টিসহ সারা দেশে ৩১ হাজার ৪৬১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। এরই মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুর্গোৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এদিকে নির্বাহী আদেশে বৃহস্পতিবার সরকারের পক্ষ থেকে ছুটি ঘোষণা করার কারণে শুক্র-শনিবার সঙ্গে রবিবার বিজয়া দশমীর সরকারি ছুটিসহ এবার মোট চার দিন ছুটি থাকছে দুর্গাপূজা উপলক্ষে।
রামকৃষ্ণ মিশনের নির্ঘণ্টে বলা হয়েছে, আজ বুধবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে দুর্গাদেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস। উৎসবের প্রথম দিন ষষ্ঠী পূজা বিকাল ৫টার পরে আরম্ভ হবে। পূজাকে আনন্দমুখর করে তুলতে দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি প্রায়ই শেষ হয়েছে। সারা দেশে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। ঢাকঢোল, কাঁসা ও শঙ্খের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মণ্ডপ।
এ বছর দেবী দুর্গার আগমন হবে দোলায় বা পালকিতে। ওই পালকি বা দোলায় দেবীর আগমন বা গমন হলে ফল হয় মড়কÑ যা শুভ ইঙ্গিত নয়। এ ছাড়াও দেবী স্বর্গে গমন করবেন ঘোটকে বা ঘোড়ায়। শাস্ত্রমতে, দেবীর গমন বা আগমন ঘোটকে হলে ফল ছত্রভঙ্গ হয়। সেই নিরিখে ২০২৪ সালে দেবীর গমন ঘোড়ায় হওয়ার জেরে ফল ছত্রভঙ্গ হতে পারে। শাস্ত্রমতে, এই ঘোটকে গমনের ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক এলোমেলো অবস্থাকে ইঙ্গিত করে। এটি যুদ্ধ, বিগ্রহ, আশান্তি, বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা বুধবার থেকে শুরু হবে যা আগামী ১৩ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। সারা দেশে এ বছর ৩১ হাজার ৪৬১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। ঢাকা মহানগরে এ বছর ২৫২টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে এবার টানা চার দিন ছুটি পাচ্ছেন চাকরিজীবীরা। অন্তর্বর্তী সরকার গতকাল মঙ্গলবার নির্বাহী আদেশে আগামী ১০ অক্টোবর সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় এই সুযোগ মিলছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে। সাধারণত দশমীর দিন সরকারি ছুটি তাকে। এবার রবিবার দশমী হওয়ায় আগের দুদিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি নিয়ে তিন দিন ছুটি পাচ্ছেন চাকরিজীবীরা। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবারও ছুটি থাকায় এবার পূজার ছুটি ৪ দিন হয়ে গেল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী নির্বাহী আদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো। সাধারণ ছুটিকালীন সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে।
পূজার ছুটি এক দিন বাড়ছে, তা প্রজ্ঞাপন জারির আগেই জানিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। এ দিন সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি পরিদর্শন শেষে তিনি বলেছিলেন, পূজার ছুটি এক দিন বাড়ানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও পূজার ছুটি থাকবে। আজকেই প্রজ্ঞাপন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবি ছিল দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ানোর জন্য। তারা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত আনন্দ উদযাপন করেন। এবার দুর্গাপূজার দশমীর আগে শুক্র-শনিবার পড়েছে। তাই সরকার চিন্তা করেছে, এবার বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) এক দিন ছুটি বাড়িয়ে দেবে; যাতে তারা পূজা উদযাপনের জন্য একটা বড় সময় পান।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হবে।
এদিকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ঢাকা মহানগরের প্রতিটি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মাইনুল হাসান। তিনি বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটা অনুষ্ঠান হলেও সারা দেশের মানুষ এর আনন্দ উপভোগ করে। ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে যাতে করে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি ভাবগম্ভীর পরিবেশে এবং যথাযথ মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হতে পারে, এজন্য বিভিন্ন ধাপে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমন্বয় সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ঢাকা মহানগরের প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্থায়ী পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি থানা পুলিশের নিজস্ব অধিক্ষেত্রে টহল ও চেকপোস্ট ব্যবস্থা এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা ও মেটাল ডিটেকটরের মাধ্যমে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আয়োজকদের মধ্য থেকে প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল থাকবে। সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে আনসার বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ র্যাব ফোর্স তাদের টহল কার্যক্রম ও অন্যান্য নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পূজায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ডিএমপি কমিশনার বলেন, পূজার দিনগুলোয় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। তবে পুরান ঢাকার দিকে রাস্তা সরু হওয়ার কারণে সেখানে যান চলাচলে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। এজন্য পূজা উদযাপন কমিটিকে অনুরোধ করা হয়েছে, পূজামণ্ডপের কাছাকাছি কোনো মেলা বা জনসমাবেশ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করার জন্য।
কমিশনার বলেন, ১৩ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হবে। এজন্য পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদী, ওয়াইজঘাট, ডেমরা শীতলক্ষ্যা নদীসহ ১৫টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। বিসর্জন শোভাযাত্রাতেও পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। এজন্য নৌ-পুলিশ ফায়ার ব্রিগেডসহ অন্যরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯-এর মাধ্যমেও সেবা গ্রহণ করা যাবে। বিসর্জনের সকল কার্যক্রম সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সম্পাদনের অনুরোধ করা হয়। এ ছাড়া বিসর্জন শোভাযাত্রা ও বিসর্জনের সময় সকল প্রকার মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ। একই সাথে পটকা ও আতশবাজির ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন তিনি।
রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব হিসেবে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মণ্ডপে পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছা রক্তদান ও বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ হিন্দু সম্প্রদায়সহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।