শাবুল আহমেদ, প্যারিস (ফ্রান্স)
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ২১:২০ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:৫৩ পিএম
রিকশাচিত্র। প্রবা ফটো
বাংলার বাউলগান, জামদানি, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও শীতলপাটি বুননশিল্পের পর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে ‘ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র’। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) ইউনেসকোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তঃসরকারি কমিটির ১৮তম অধিবেশনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। যার মাধ্যমে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেল বাংলার চিরায়ত রিকশা ও রিকশাচিত্র।
এর আগে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বাউলগান, ২০১৩ সালে জামদানি বুননশিল্প, ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও ২০১৭ সালে শীতলপাটি বুননশিল্প ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় স্থান পেয়েছিল। এই তালিকায় পঞ্চম সংযোজন রিকশা ও রিকশাচিত্র।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিষদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইউনেস্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি খন্দকার এম তালহা এই স্বীকৃতিকে বাংলাদেশের সকল রিকশাচিত্র শিল্পীদের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অরও বলেন, ‘আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা বিনির্মাণ ও যানবাহনের যান্ত্রিকীকরণের ফলে বড় শহরগুলোতে রিকশা চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে ধীরে ধীরে রিকশা ও এর নান্দনিক চিত্রকর্ম হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই চিত্রকর্মটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশ এই নথিটি প্রস্তুত করে। এই নিবন্ধনের ফলে বিগত আট দশক ধরে চলমান এই চিত্রকর্ম একটি বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করল।’ তিনি এই অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উৎসাহ ও সানুগ্রহ দিকনির্দেশনার কথা তুলে ধরেন। এই স্বীকৃতির ফলে রিকশাচিত্রের সংরক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী এই চিত্রকর্মকে তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশের দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
গত ৪ ডিসেম্বর সোমবার আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমি অধ্যুষিত দেশ বতসোয়ানার কাসান শহরে শুরু হয় ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি কমিটির এই অধিবেশন। ছয় দিনের এই অধিবেশনে গতকাল বুধবার উপস্থাপিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমূর্ত ঐতিহ্য। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর উপস্থাপন করা হয় নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্য।
এই অধিবেশনে বাংলাদেশের রিকশা ও রিকশাচিত্র দেখানো হয় একটি তথ্যচিত্রে। নয় মিনিট ১৬ সেকেন্ড ব্যাপ্তির এই তথ্যচিত্রে বলা হয়, ঢাকা শহরের তিন চাকার এই বাহনে রয়েছে বিভিন্ন রঙের বৈচিত্র্য। বাহন হিসেবে ঢাকা শহরের মানুষের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে রিকশা। রিকশাচিত্র শুধু শিল্প নয়, এটি মানুষের সমকালীন জীবনের গল্প বলার চলমান ক্যানভাস। রিকশাচিত্রের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে শুরু করে নানা বিষয়ের মধ্যে চলচ্চিত্রের অভিনেতাদের প্রতিকৃতিও ফুটে ওঠে। এ ছাড়াও তথ্যচিত্রে কয়েকজন রিকশাচিত্রীর সাক্ষাৎকার এবং তাদের কাজের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটের ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অংশে ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র নিয়ে বলা হয়েছে, রিকশা হলো তিন চাকার ছোট যাত্রীবাহী যান, যা একজন ব্যক্তি টেনে নেয়। এটি ঢাকা এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্যগতভাবে কারিগরদের হাতে তৈরি এই বাহনের প্রায় প্রতিটি অংশ রঙিন ফুল, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি, পাখি ও প্রাণী, ঐতিহাসিক ঘটনা, নানা উপকথা, চলচ্চিত্রের ঘটনা, নায়ক-নায়িকা ও বিভিন্ন বিষয়ে লেখা থাকে। রিকশা এবং রিকশাচিত্র ঢাকা শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। যাকে শহুরে লোকশিল্পের শক্তিশালী ধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে এই সভায় প্রতিনিধিত্ব করেন প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খন্দকার মুহম্মদ তালহা ও দূতাবাসের প্রথম সচিব ওয়ালিদ বিন কাশেম।
বিগত ছয় বছর যাবৎ এই চিত্রকর্মটি নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি চলমান থাকলেও প্রথম চেষ্টায় তা ব্যর্থ হয়। তবে ২০২২ সালে পুনরায় নথিটি জমাদানের সুযোগ প্রদান করা হলে প্যারিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নথিটি নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়।
সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব খলিল আহমেদ এই অর্জনকে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান হিসেবে অভিহিত করেন। এ ছাড়াও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্যারিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং বাংলা একাডেমিকে অভিনন্দন জানান।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের জুলাই মাসে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়।
‘বিমূর্ত ঐতিহ্যের সুরক্ষা’ স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া ইউনেস্কোর এ অধিবেশনে এবার আরও স্বীকৃতি পেয়েছে নেদারল্যান্ডের রটারডাম সামার কার্নিভাল, তাজাকিস্তানের ঐতিহ্যগত কাপড় বুননশিল্প, ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী নাচ দাবকেহ, ফিলিপাইনের আকলান পিনা তাঁত বয়ন, মেক্সিকোর বলেরো গান, ভারতের গরবা, মধ্যপ্রাচ্যে কিউবা, আমের্নিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও বেশ কিছু বিমূর্ত ঐতিহ্য।
ইউনেস্কোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তঃসরকারি কমিটির ১৮তম অধিবেশন শেষ হবে আগামী শনিবার।