কৌশল নির্ধারণে আজ বসছে স্থায়ী কমিটি
বাছির জামাল
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৪ ১০:১৮ এএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪ ১১:১১ এএম
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ফাইল ফটো
ভারতবিরোধিতার ক্ষেত্রে কৌশলী অবস্থান নিয়ে এগোতে চাইছে দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। কিন্তু সেই কৌশল কী হবে- তা এখনও স্পষ্ট করেননি নেতারা। আজ সোমবার (২৫ মার্চ) বিএনপির নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এ বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। যার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, বিএনপি ভারতের ব্যাপারে কী ধরনের কৌশল নিতে চায়।
তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতারা এরই মধ্যে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, ভারতের নেতিবাচক কার্যক্রমের বিরোধিতা করা হবে। এখন থেকে ভারতের যেকোনো কর্মকাণ্ড তারা পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রতিক্রিয়া জানাবেন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বিএনপি ইতোমধ্যে সরব হয়েছে।
অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভারতীয় পণ্য বর্জনসহ দেশটির স্বার্থ বিঘ্নিত করার প্রচারাভিযানের সঙ্গে এরই মধ্যে সংহতি প্রকাশ করেছে দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এর মাধ্যমে বিএনপি ভারতের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের এই বার্তা দিতে চাইছে যে, নির্বাচনে ভারত জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে একটি দলকে সমর্থন দিয়েছে- যা রাষ্ট্র হিসেবে তাদেরও স্বার্থের বাইরে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফরে আসা তখনকার ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ বাতিলকে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির জন্য দায়ী করা হয়। তা ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক বাতিল হওয়ার ঘটনায় দু’পক্ষের মধ্যে চরম অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর ২০১৪ সালে বিরোধীদল ছাড়াই সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারতের তত্পরতা ছিল দৃশ্যমান।
সেবার তখনকার ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব নিজেই ঢাকায় এসে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এরপর থেকে বিএনপি ভারতের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করে আসছিল। ভারতকে খুশি করতে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ২০ দলীয় জোটকে পাশ কাটিয়ে নতুন নির্বাচনী জোট করে। কারণ জামায়াতে ইসলামী ওই জোটে ছিল। বিএনপির নেতারা তখন ভারতের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতেন। এমনকি ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের সময়ও ভারত প্রশ্নে সতর্ক ছিল বিএনপি।
দলটির নেতারা মনে করেছিলেন যে, এই নির্বাচনে ভারত কোনো দলের পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ভারত শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ ভূমিকায় না থেকে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই সমর্থন দেয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের ওপর পশ্চিমাদের চাপ থাকলেও ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতায় ‘বিরোধী দলহীন নির্বাচন’ করতে পেরেছে সরকার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি ভারতের ওপর রুষ্ট হয়। এ কারণেই ভারতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়।
দ্বাদশ জানুয়ারির নির্বাচনের অব্যবহিত পর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি থেকেও আঁচ করা যায়, বিএনপির সঙ্গে ভারতের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের নয়, চীন-রাশিয়া-ভারতের সরকার’। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম গত ২৩ মার্চ বলেন, ‘ভারতের আনুগত্য নিয়ে আওয়ামী সরকার দেশ চালাচ্ছে।’
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের বিষয়ে দলের অবস্থান কী, সে বিষয়ে বিভিন্ন সময় দলীয় ফোরামে আলোচনা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয়ভাবে ভারতের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরোধী অবস্থান ধরে রাখতে চান দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তবে সেটি শুধু বিরোধিতার অর্থে নয়। দেশের স্বার্থ ও সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এ বিষয়ে কর্মকৌশল ঠিক করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, ‘সীমান্তে হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক বৈষম্য, রাজনীতিতে হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি ভারতবিরোধী অবস্থান গড়ে তোলার পক্ষে নেতাদের প্রায় সবাই একমত। তা ছাড়া ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকে বিএনপি সব সময় সমর্থন জানিয়ে এসেছে। রাজনীতির সেই ধারাটিকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমরা কোনো দেশের বিরোধী নই। আমরা আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলি। সেই ক্ষেত্রে তা কোনো দেশের বিরুদ্ধে যেতেও পারে।’
এ ব্যাপারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘ভারত বৃহৎ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আমরা এই গণতান্ত্রিক প্রতিবেশীর সঙ্গে সব সময় সম্পর্ক ভালো রাখতে চাই। তাই ভারতের উচিত হবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে। দেশ কীভাবে চলবে তা নির্ধারণ করবে জনগণ। দেশবাসীই ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবে, কে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। আর এই অবৈধ সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ভারতের নীতিনির্ধারকরা। এ কারণেই বাংলাদেশের জনগণ ভারতের বিরুদ্ধে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে।’
এদিকে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গী ১২ দলীয় জোটের নেতারা গত ২২ মার্চ রিজভীর সঙ্গে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে দেখা করেন। এ সময় তারা ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে তাকে ধন্যবাদও জানান। প্রসঙ্গত, রিজভী গত ২০ মার্চ দলীয় কার্যালয়ের সামনে তার নিজের গায়ে থাকা ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে ‘ভারতীয় পণ্য বর্জনের’ প্রচারাভিযানে সংহতি জানান। এদিকে ১২ দলীয় ও গণঅধিকার পরিষদ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে থাকা আর কোনো শরিক দলই ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলনে প্রকাশ্যে নেই।
বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রমজান শেষ হলে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচার জোরেশোরে শুরু হবে। বিএনপি দলগতভাবে প্রকাশ্যে না নামলেও তার প্রতি নমনীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ভারতবিরোধী নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে ও ভার্চুয়াল জগতে সোচ্চার হবে।