প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:২৮ পিএম
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:৩১ পিএম
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বাতিলসহ নানা দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। রাজধানীতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে গাড়িতে করে উত্তরা থানায় নেওয়ার পর পুলিশ বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। ঢাকার বাইরে মঠবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ, নরসিংদী ও কুড়িগ্রামের উলিপুরে কালো পতাকা মিছিলে বাধা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধস্তাধস্তিও হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় সহপ্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদসহ পুলিশ প্রায় ৫০ নেতাকর্মীকে আটক করেছে। একই সঙ্গে আহত হয়েছে শতাধিক নেতাকর্মী। তবে এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) লিটন কুমার সাহা বলেছেন, ‘বিএনপির কর্মসূচিতে তেমন কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। কর্মসূচি থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের আটকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
‘ডামি নির্বাচনের অবৈধ সংসদ’ বাতিল, নির্দলীয় তত্ত্বাবায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকাসহ সারা দেশে এই কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচির ডাক দেয় বিএনপি এবং সমমনা জোটগুলো। এদিন দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন থাকায় ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে পুলিশ। জাতীয় সংসদ ভবনসহ এর আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভাসমাবেশ ও মিছিল-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, ঢাকায় বিএনপির কালো পতাকা মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এদিকে ঢাকা বাদে সারা দেশে লাল-সবুজ পতাকা হাতে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। সিলেট, মাগুরা, খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রামের উলিপুর, উজিরপুরসহ অন্যান্য স্থানে সরকারি দল এ সমাবেশ করে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগ পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করার প্রস্তুতি নিলেও পরে গতকাল সোমবার তা স্থগিতের কথা জানানো হয়।
রাজধানীতে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে বাধা
রাজধানীর সাতটি স্পটে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। তবে এ বাধা উপেক্ষা নিউমার্কেট, দয়াগঞ্জ, বাড্ডা ও মিরপুরে মিছিল করেন দলটির নেতাকর্মীরা। উত্তরার ১২ নং সেক্টর থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে পুলিশ গাড়িতে করে উত্তরা থানায় নিয়ে যায়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিএনপি দাবি করেছে, আজিমপুর, পীরজঙ্গি মাজারসহ বিভিন্ন স্পট থেকে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ছিল সাতটি স্পটে। এগুলো হলো- উত্তরা ১২ নং সেক্টর, মিরপুর ১২ নং, বাড্ডার সুবাস্তু নজর ভ্যালি, পীরজঙ্গি মাজার সড়ক মোড়, নিউমার্কেট, দয়াগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী।
বেলা ২টায় উত্তরার ১২ সেক্টর কবরস্থানের কাছে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচিতে আসেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। গাড়ি থেকে নামার পরপরই পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে এবং কোনো কর্মসূচি করতে দেবে না বলে জানায়। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। গাড়িতে তোলার আগে মঈন খান পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কী অপরাধ করেছি?’
মঈন খান ১২ নম্বর সেক্টরের এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন। গাড়িতে তোলার কয়েক মিনিট আগে তিনি সেখানে পৌঁছেন। এ সময় কিছু নেতাকর্মী রাস্তায় দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে ৮ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য দৌড়ে আসেন। এ সময় মঈন খান বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করে যাব। রাজপথে থাকব।’ এ সময় পুলিশ মঈন খানকে গাড়িতে তুলে নেয়। তখন সমাবেশও পণ্ড হয়ে যায়। এ বিষয়ে পুলিশের উত্তরা পশ্চিমের এডিসি সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তারা (বিএনপি) সমাবেশের চেষ্টা করেছিল। তবে এটা অনুমোদনহীন।’
মঈন খানকে তুলে নেওয়ার ব্যাপারে এডিসি সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। আসলে ওনার নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। যে কারণে আমরা তাঁকে একটু সরিয়ে নিয়েছি আরকি।’ কী ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি ছিল, জানতে চাইলে এডিসি সালাহউদ্দিন বলেন, ‘মঈন খানের ব্যক্তিগত ও শারীরিক ঝুঁকি ছিল।’
পরে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আবুল হাসান বলেছেন, ‘মঈন খানকে কেউ আটক করেনি। তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’
বেলা ৩টায় মতিঝিলের পীরজঙ্গী মাজারের সামনে কালো পতাকা মিছিলের আগেই বেলা ২টা ২০ মিনিটে সেখানে আসেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। কিন্তু পুলিশের কড়াকড়িতে সেখানে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে পারেননি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে চলে যান তিনি।
তিনি বলেন, ‘মিটিং ও মিছিল করা সাংবিধানিক অধিকার। আমরা যথাসময়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। এরপরও আজিমপুর থেকে প্রায় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের এক দফার আন্দোলন চলমান থাকবে। এটা আমরা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অব্যাহত রাখব।’
মতিঝিল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আজকে কালো পতাকা মিছিলের কোনো অনুমতি নাই। সেই কারণে এখানে আমরা তাদের নিষেধ করেছি।’
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য ইকবাল হোসেন সোহেল জানান, মিরপুর-১২ বাসস্ট্যান্ডে কালো পতাকা মিছিলস্থলে নেতাকর্মীরা জড়ো হন। হঠাৎ পুলিশ ধাওয়া দিয়ে সেখান থেকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য (দপ্তর) জিয়াউর রহমানসহ অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। তবে এসব উপেক্ষা করে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর এলাকায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নেতৃত্বে কালো পতাকা মিছিল করেন নেতাকর্মীরা। দয়াগঞ্জে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে মিছিল হয়। এতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনসহ বিএনপিও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
যাত্রাবাড়ীতে করতে না পেরে বিকাল ৫টায় কাকরাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে কালো পতাকা মিছিল হয়। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্বাস্থ্য সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম, তাঁতী দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, মৎস্যজীবী দলের সদস্য সচিব আব্দুর রহিম প্রমুখ নেতারা।
নারায়ণগঞ্জে পুলিশের বাধায় পণ্ড : পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়েছে বিএনপির কালো পতাকা মিছিল। বিকালের দিকে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল করতে চাইলে এ ঘটনা ঘটে। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদ্য কারামুক্ত সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর নেতৃত্বে এ মিছিল শুরু হলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশ স্থান ত্যাগ করে বালুর মাঠ এলাকায় গিয়ে মিছিল বের করে।
নোয়াখালীতে বাধা : জেলার বেগমগঞ্জে বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে পুলিশের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় পুলিশের লাঠির আঘাতে বিএনপির ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। দুপুরে চৌমুহনী বাজারের টাউন হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কেউ আহত হয়েছেন এমন খবর আমাদের জানা নেই। বিএনপির লোকজনের ওপর কোনো লাঠিচার্জ করেনি পুলিশ।
নোয়াখালী সদর উপজেলা এবং পৌরসভা বিএনপিও কালো পতাকা মিছিল করেছে।
নরসিংদী : দুপুরে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা বিএনপির চিনিশপুরস্থ অস্থায়ী কার্যালয় থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে কার্যালয়ের ভেতরেই কালো পতাকা মিছিল করেন তারা।
লক্ষ্মীপুর : জেলায় কালো পতাকা মিছিল করতে গিয়ে আবদুল সোহান নামে এক ছাত্রদল নেতা আটক হয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে সদর উপজেলার বটতলি বাজার এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। আটক সোহান উপজেলা দত্তপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক।
চন্দ্রগঞ্জ থানা বিএনপির আহ্বায়ক বেলাল হোসেন ও সদস্য সচিব আনোয়ার হোসেন বাচ্চুর নেতৃত্বে বটতলি বাজারে মিছিল বের করে বিএনপি। একপর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদল নেতা সোহানকে আটক করে। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পুলিশ সোহানকে মারধরও করেছে।
জেলার রামগঞ্জ উপজেলা ও পৌর বিএনপির উদ্যোগে জনসভা হয়েছে। সকালে বিএনপি কালো পতাকা মিছিল করতে গেলে পুলিশি ব্যারিকেডের মধ্যে পড়েন নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় পৌর নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে এ সভা হয়।
মঠবাড়িয়া : পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় কালো পতাকা মিছিল পণ্ড করে দিয়েছে পুলিশ। দুপুরে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কেএম হুমায়ূন কবির ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু বকর সিদ্দিক বাদলের নেতৃত্বে শহরে পৃথক দুটি মিছিল বের করা হয়। এ সময় যুবদলের দুই নেতাকে আটক করে পুলিশ। তারা হলেন- উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কাওসার মল্লিক ও পৌর যুবদল নেতা মো. বেল্লাল হোসেন।
উলিপুর : কুড়িগ্রামের উলিপুরে বিএনপির কালো পতাকা মিছিল পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়েছে। বিকালে উপজেলা পরিষদের গেট থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। তখন বিএনপির নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে ফিরে এসে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা করে।