প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৪ ২১:১৯ পিএম
আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪ ২১:২৪ পিএম
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সংহতি মিলনায়তনে আলোচনা সভায় সাইফুল হক। প্রবা ফটো
রুশ বিপ্লব ও আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির মহান নেতা ভি আই লেনিনের মৃত্যু শতবর্ষের এক আলোচনা সভায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্বের মধ্যে লেনিন অন্যতম। তিনি মানুষের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘লেনিন তার বিপ্লবী মতাদর্শ ও বিপ্লবী রাজনৈতিক তৎপরতার প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও বিশ্বব্যাপী হয়েছে। শোষণ ও বঞ্চনার পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে সাম্যবাদী সমাজের লক্ষে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে গড়ে তোলা সম্ভব লেনিন ও তার বলশেভিক বিপ্লবী পার্টির সহযোদ্ধারা রাশিয়ায় বাস্তবে তা প্রমাণ করেছেন। লেনিন রাশিয়ায় বিপ্লবের মতাদর্শিক-রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শরীরে এই বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন।’
রবিবার (২১ জানুয়ারি) বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সংহতি মিলনায়তনে আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
২১ জানুয়ারি লেলিনের মৃত্যু শতবর্ষ। এ উপলক্ষ্যে ‘লেনিন পরবর্তী একশ বছর ও রাষ্ট্র- বিপ্লবের প্রশ্ন’ শীর্ষক আলোচনার আয়োজন করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি।
সাইফুল হক বলেন, ‘মানব ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির অন্যতম হচ্ছে রুশ বিপ্লব; যা শোষণ ও বৈষম্যমূলক অমানবিক পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। রুশ বিপ্লব শ্রমদাসত্বের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সাম্যভিত্তিক নতুন এক মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, মানুষে মানুষে নতুন সম্পর্ক, নতুন সভ্যতা, নতুন মূল্যবোধ, অগ্রসর নতুন সংস্কৃতির উদ্বোধন ঘটিয়েছিল, সব শৃঙ্খল থেকে মানুষের মানবিক সত্তার মুক্তির সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘লেনিন কোনোভাবেই কেতাবী মার্কসবাদী বিপ্লবী ছিলেন না।পুঁজিবাদের বিকাশ, সাম্রাজ্যবাদী স্তরে তার প্রবেশ , তার অভ্যন্তরীণ গভীর সংকট ও সীমাবদ্ধতা, নতুন অজেয় শ্রেণী হিসাবে শ্রমিকশ্রেণীর উত্থান ও বিকাশ, রাষ্ট্র তথা গোটা শাসন ব্যবস্থার সংকট ও বৈপরীত্য বিবেচনায় নিয়ে লেনিন রুশ বিপ্লবের তাত্ত্বিক কাঠামো, রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করেছিলেন। মার্কস-এঙ্গেলস যেখানে অগ্রসর পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের সাম্যবাদী দর্শন ও রাজনীতির তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন লেনিনকে সেখানে তুলনামূলকভাবে সংকটগ্রস্ত অবিকশিত পুঁজিতান্ত্রিক পশ্চাৎপদ কৃষিনির্ভর দেশ রাশিয়ায় সৃজনশীলভাবে সমাজ বিপ্লবের জনা নতুন রাজনৈতিক প্রস্তাবনা হাজির করতে হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ রুশ বিপ্লব বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন গতি ও সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। এর মধ্যদিয়ে মানুষের অধিকার ও মুক্তির স্বপ্নও নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছিল। রাশিয়াসহ পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের অনুশীলন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির দিক থেকে তার ঐতিহাসিক ন্যায্যতার প্রমাণ দিয়েছে; মানবিক সমাজ হিসাবেও তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।’
সাইফুল হক বলেন, ‘মতাদর্শিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নানা বিচ্যুতি, ঘাটতি ও দুর্বলতার কারণে ৭২ বছর পর খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেই এই ব্যবস্থা টেকেনি সত্য; কিন্তু পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা টিকে থাকলেও তা কোনো দিক থেকেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে উন্নত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসাবে প্রমাণ করতে পারেনি; পারেনি তার ধারাবাহিক নিদারুণ সংকটের কোনো নিদান দিতে। বরং গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার অবশিষ্ট উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ক্রমে আরও অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, প্রবল কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র গ্রহণ করছে। মানুষকে শ্রমদাসত্বের পাশাপাশি বহুমাত্রিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখছে। এই ব্যবস্থায় মানব জাতির কোনো মুক্তি নেই।’
তিনি বলেন, ‘লেনিন পরবর্তী একশ বছরে দুনিয়ায় নানা দিক থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে তা সন্দেহ নেই। কিন্তু যে পর্যন্ত শোষণ ও বঞ্চনানির্ভর নিষ্ঠুর ও অমানবিক পুঁজিতান্ত্রিক-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বহাল আছে ততদিন মানুষের অধিকার ও মুক্তি অর্জনে সাম্যভিত্তিক সমাজব্যবস্থার জরুরত থাকবে। এই সংগ্রামে লেনিন, তার বিপ্লবী চিন্তা ও কর্মযজ্ঞ থাকবে আলোকবর্তিকা হিসাবে। আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণী তথা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লেনিন থাকবেন অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে।’
পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভার শুরুতেই দুই মিনিট নিরবে দাঁড়িয়ে লেনিনের বিপ্লবী স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয়।
সভায় লেনিনের মৃত্যু শতবার্ষিকীতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করেন পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আকবর খান, আবু হাসান টিপু, মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাক প্রমুখ।