সংসদ নির্বাচন
দীপক দেব
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৮:৫৩ এএম
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪৪ এএম
আসন ছাড় নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপড়েন শুরু হয়েছে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর। তিন দলকে দেওয়া ৭ আসন তৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করে তা পুনর্বিবেচনার করতে জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করার আগ্রহ দেখিয়েছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। অন্যদিকে বিগত নির্বাচনগুলোতে জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা নিয়ে এমপি হওয়া তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারির নাম ঘোষিত তালিকায় না থাকায় শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে নিজের প্রত্যাশা ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরেছেন। এদিকে ক্ষুব্ধ শরিকদের বোঝানোর চেষ্টাও চালানো হচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ১৪ দলের সমন্বয়ক মুখপাত্র আমির হোসেন আমু জোট শরিকদের ৭টি আসন ছাড়ার কথা জানান। শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে তিনটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) তিনটি এবং জাতীয় পার্টিকে (জেপি) ১টিসহ মোট সাতটি আসন দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। রাতেই এই তালিকা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখান জোটের দুই নেতা হাসানুল হক ইনু ও নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি।
সমঝোতা না হলে কি করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ইনু বলেন, ‘পুনর্বিবেচনার কি ফলাফল হয় দেখা যাক। তারপর আমরা উত্তর দিব।’ জাতীয় প্রেসক্লাবের যে অনুষ্ঠানে হাসানুল হক ইনু এই কথা বলেন সেখানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান চলাকালেই মঞ্চে এসব বিষয় নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হয় বলে জাসদের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। বাহাউদ্দিন নাছিম হাসানুল হক ইনুকে তাদের দাবির বিষয়গুলো নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন।
এদিকে জাসদের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, জোটের পক্ষ থেকে মাত্র তিনটি আসনে জাসদকে ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলটির মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। দলটি নেতাদের দাবি, জোট গঠন হওয়ার পর থেকে জাসদ সব সময় আওয়ামী লীগের পাশে থেকে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। এমনকি বিএনপি-জামায়াত সারাদেশে যখন আন্দোলনের নামে নাশকতা চালিয়েছে তখন জাসদ রাজপথে থেকে প্রতিবাদ করেছে, মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মূল্যায়নের সময় জাসদকেও অন্যদের সাথে গড় হিসাবের মধ্যে ফেলা হচ্ছে।
চৌদ্দদলীয় জোটের ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় নিজের নাম না থাকলেও চুড়ান্তভাবে জোটের প্রার্থী থাকবেন এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন নজিবুল বসর মাইজভান্ডারি। তার নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম-২। এ আসনটি এবার বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টিকে দেওয়ার গুঞ্জন নিয়েও তিনি কথা বলেন, ‘তিন মাস আগে নিবন্ধন পেয়ে যদি কেউ মনোনয়ন পায়, তাহলে রাজনীতির অবস্থান কোথায় যাবে? সুপ্রিম পার্টি তো জোটে নাই। তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড কী? ক্যারিয়ার কী? হঠাৎ কেউ এল, দু-চারটা প্রোগ্রাম করল, বলে দিলেন আছে! এটা দেশের জন্য, আগামী রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী বলেন, ‘গত ৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গণভবনে ১৪ দলের বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আমরা সে সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল রয়েছি। জনগণের ভোটে শেখ হাসিনা আবারও নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হবেন, এ ব্যাপারে যেমন কোনো ভুল নেই, তেমনি বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবে এটিও নিশ্চিত।’ শুক্রবার রাতে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ১৪ দলের সমন্বয়কারী আমির হোসেন আমুর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন বলে জানা গেছে। এসব প্রসঙ্গে নজিবুল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। আসনের বিষয়টি নিয়ে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন।’ এদিকে সাতটি আসনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে আসন সংখ্যা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন জাসদ সভাপতি। একই সঙ্গে তিনি শর্ত দেন, যেসব আসনে তাদের ছাড় দেওয়া হবে সে আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের ও স্বতস্ত্র প্রার্থী উঠিয়ে নিতে হবে।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, শরিকদের আসন ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও স্বতন্ত্রদের নিয়ে শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়ার কথা এখন পর্যন্ত ভাবছে না দলটির হাই কমান্ড। এসব নিয়ে শুক্রবার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই আসন সমঝোতা নিয়ে কথা বলেন, এখানে আমরা এই সময়ে আমাদের এ অ্যালায়েন্সটাকে যতটা রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছি, এখানে আসনের বিষয়টা মুখ্য না। এখানে মুখ্য হচ্ছে রাজনীতি। জঙ্গিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের এ ইলেকশন।’ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘প্রতিযোগিতা হোক। এখানে পক্ষপাতিত্বের কী আছে? আমরা জোর করে কারও বিজয় ছিনিয়ে আনব না। আমরা কাউকে বিজয়ের গ্যারান্টি দিতে পারব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি পার্টির সাধারণ সম্পাদক, আমার বিরুদ্ধেও চারজন (স্বতন্ত্র প্রার্থী) আছেন। এখন কেউ যদি জিতে যান, তাহলে তো আমাকেও হার মানতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা যেটা আছে সেটা আমরা মেনে নিয়েছি।’ আগামী সোমবার ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়ন ফরম প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর আগেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শরিকদের কয়টি আসন ছাড়া হবে ও জাতীয় পার্টির সাথে কয়টি আসন সমন্বয় করা হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন।