দীপক দেব
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:৩৮ পিএম
১৪ দলীয় জোটে আসন বণ্টন বিষয়টির দ্রুত সমাধান চায় আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলো। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘কালক্ষেপণে’ শরিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি দল চেয়েছিল ১৭ ডিসেম্বর আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করতে। কিন্তু শরিক দলগুলোর জোর আপত্তির মুখে তা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি গত রবিবার জোটের সর্বশেষ বৈঠকে শরিক দলগুলোর দেওয়া প্রত্যাশিত তালিকার ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
আসন বণ্টন নিয়ে ১৪ দলে ইতোমধ্যে তিন দফা বৈঠক হয়েছে। তবে রবিবারের বৈঠকে শরিক দলগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। শরিক দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, এবার ১৪ দলের শরিক দলগুলোর মধ্যে অনেকেই আওয়ামী লীগের কাছে আসন চেয়েছে। বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে না, এমন দলও ইতোমধ্যে আসন ছাড় চেয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে। সংসদে বর্তমানে প্রতিনিধিত্ব করছে জোটে আওয়ামী লীগের শরিক চারটি দল। সেগুলোর মধ্যে কমপক্ষে তিনটি দল আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তাদের তালিকা জমা দিয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে। সেখানে এই তিন দলের বর্তমান সাতজন এমপিসহ আরও কমপক্ষে ২৩টি আসনের প্রার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবার শরিকদের গতবারের থেকেও আসন কম দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই কথাবার্তা শুরু করেছে। শরিকরা যেন ঠিকভাবে দরকষাকষি করতে না পারে, এজন্য বৈঠকের নামে কালক্ষেপণ করা হয়েছেÑ শরিক দলগুলোর কোনো কোনো নেতা এমনই মনে করছেন।
গত ৪ ডিসেম্বর গণভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। তিনি বৈঠকে আসন বণ্টন নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে একটি টিম গঠন করে দেন জোটনেত্রী। প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথকভাবে বসে আসন সমন্বয় করার প্রস্তাবও তোলা হয় সেই বৈঠকে। তবে ওই বৈঠকের পর জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমুর সঙ্গে তার বাসায় বৈঠক করেন জোটের দুটি দলের তিনজন নেতা। সেখানে অন্য শরিক দলগুলোর কাউকে দেখা যায়নি। কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় ওই বৈঠক। জোটের অন্যদের না জানিয়ে এভাবে বৈঠক করে সেটাকে ১৪ দলের সভা হিসেবে গণমাধ্যমের সামনে চালানোর কারণে জোটের কোনো কোনো শরিক দল ক্ষোভ প্রকাশও করেছে আওয়ামী লীগের কাছে।
বর্তমান সংসদে ১৪ দলের মধ্যে চারটির ৮ জন সংসদ সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে জাসদের তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টির তিনটি, তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টি জেপির একটি করে আসন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এবার আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, জোটের সাতটি আসনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও ফেনী-১ আসনে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রসঙ্গত, এ আসনের সংসদ সদস্য জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। অন্যদিকে জোটের শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এখন দাবি তোলা হয়েছে যে, যেসব আসনে ছাড় দেওয়া হবে, সেগুলোতে নৌকা প্রতীকে ভোট করার সুযোগ দিতে হবে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও প্রত্যাহার করে নিতে হবে। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিষ্ক্রীয় করার বিষয়ে শরিকদের আশ্বস্ত করা হয়নি।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানাচ্ছে, আমির হোসেন আমুর বাসার বৈঠকে জোটের আসনগুলোর বিষয়ে সমাধান না হওয়ায় শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে দ্রুত সমাধানের তাগিদ দেয়। এ অবস্থায় রবিবার রাতে জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের কার্যালয়ে ১৪ দলের শরিক দলের নেতাদের নিয়ে ফের বৈঠকে বসে প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বৈঠকে রাশেদ খান মেনন দ্রুত শরিক দলগুলোর আসন ঘোষণার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, আসন নিয়ে আমাদের কাছে সবকিছু স্পষ্ট করেন। জোট আছে কি নাই, সেটাও স্পষ্ট করেন। আসন ছাড়লে, আমাদের কোথায় ছাড়বেন, আর কোথায় ছাড়বেন না সেটাও এখনই পরিষ্কার করেন। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও একই রকম বক্তব্য দেন।
জবাবে ওবায়দুল কাদের তাদের জানান, শরিক দলগুলোর দেওয়া তালিকা ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি চার দিন বসেছেন। তালিকাভুক্ত প্রতিটি আসনের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। দেখা গেছে, সাংগঠনিক কোনো শক্তি না থাকার পরেও অনেকেই প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বৈঠকে ওবায়দুল কাদের জোটের নেতাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা কে কয়টি আসন চাইছেন, তা স্পষ্ট করে জানাতে। এই সময় কোনো দল থেকে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়নি। শরিকদের নিশ্চুপ অবস্থা দেখে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে তো কোনো সমন্বয় নেই। কে কয়টা আসন নেবেন, এটাই তো আপনারা ঠিক করেননি।’ একপর্যায়ে জোটের শরিক দল তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, ‘মেনন ভাইদের এখন সিট আছে তিনটা। আপনারা (আওয়ামী লীগ) এবার কয়টা দিবেন? ইনু ভাইদের আছে তিনটা, একটা আসনের বিষয়ে (শিরীন আখতার) আপনারা কথা বলেছেন। এর বাইরে আপনারা কী দিবেন বলেন।
জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভান্ডারী ভাই যেভাবে বলছেন, এভাবে আগে থেকে বললে তো আর এত সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। এখন আমরা আমাদের দলীয় সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত তালিকা ঠিক করব।’
এ সময় শরিকদের পক্ষ থেকে তিন দিনের মধ্যে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করার দাবি জানানো হলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রথমে ১৭ ডিসেম্বর ও পরে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ভাগাভাগির কথা জানানো হয়।
১৪ দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দুটি দল আমু ভাইয়ের বাসায় গিয়ে বৈঠকে বসে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যার খেসারত সবাইকে দিতে হচ্ছে। আমাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকার সুযোগ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তারা এসব করে কালক্ষেপণ করছে। যেন শেষ মুহূর্তে আর দেনদরবার করার সুযোগ না থাকে।’
এসব বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু গতকাল সোমবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আসন ভাগাভাগি একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য একটু সময় লাগছে। আশা করছি, শিগগির সমাধান হয়ে যাবে।’ তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেটাই হোক, সকলের জন্য সম্মানজনক হোক। গতবারের আসনের ভিত্তিতে একটা ফয়সালা হবে বলে মনে করি। ১৫ ডিসেম্বর আসন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে বলে আশা করি।’