বাছির জামাল
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:৫৫ এএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে না যাওয়া দলগুলোকে নিয়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরম গড়ে তোলায় নজর দিয়েছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এজন্য ‘যুগপৎ ধারার’ কৌশল বাদ দিয়ে এক মঞ্চ থেকে আন্দোলন করারও চিন্তা করছে দলটি। আন্দোলনের এই মঞ্চে এক সময়ের কাছের মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে যুক্ত করতে চায় বিএনপি। এ নিয়ে উভয় দলের হাইকমান্ডের মধ্যে কয়েক দফা কথাবার্তাও হয়েছে। যুগপৎ আন্দোলনের অন্য শরিকদের কাছেও এ বিষয়টি তুলেছে বিএনপি। তবে যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে এক মঞ্চে আন্দোলন করতে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপির এক দফার আন্দোলনের অন্যতম শরিক দল গণতন্ত্র মঞ্চ। এর বাইরে চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও তাদের আপত্তির কথা বলে দিয়েছে বিএনপিকে। যদিও ৯ ডিসেম্বর দলের শুরার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ওই দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পর্যায়ে আন্দোলনকে সংগঠিত করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। আন্দোলনের প্রথম পর্যায়টি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে কর্মসূচি পালন করতে না পারায় হরতাল-অবরোধেই থাকছে বিএনপি। তবে এর ফাঁকে ফাঁকে অন্য কর্মসূচি দেওয়া হবে। ১৮ ডিসেম্বর বা এর পর থেকে একেবারে নির্বাচনের দিন ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনকে আরও কঠোর করার চিন্তা করছে বিএনপি।
বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবরের পর থেকে বিএনপি যে কর্মসূচি দিচ্ছে, তা প্রথম দিকে ভালোভাবে পালিত হলেও দিন যত যাচ্ছে, কর্মসূচি পালনে ততই ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সকালে ও রাতে কয়েকটি ঝটিকা মিছিল দেখা গেলেও তাতেও নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ একেবারেই কম। তাদের মতে, ‘অবরোধ’ হচ্ছে জোর করে জনগণকে কর্মসূচি মানতে বাধ্য করা। কিন্তু এই কর্মসূচিতে মাঠে নেতাকর্মীদের দেখা যায় না। এ অবস্থায় নতুন করে বৃহত্তর পরিসরে এক মঞ্চ থেকে আন্দোলন করার যে চিন্তা করা হচ্ছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীকে যুক্ত করতে চায় বিএনপি।
গণতন্ত্র মঞ্চের একটি সূত্র জানায়, বৃহত্তর পরিসরে আন্দোলনের মঞ্চে জামায়াতকে রাখার বিষয়টি এরই মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চকে জানিয়েছে বিএনপি। বাম ঘরানার ৬টি দলকে নিয়ে গঠিত যুগপৎ আন্দোলনের প্রভাবশালী এই শরিক জোটের নেতারা বিএনপির এই প্রস্তাব নিয়ে এরই মধ্যে গত সোমবার দিনভর বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তারা জামায়াতকে নিয়ে এক মঞ্চে আন্দোলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা ইতোমধ্যে বিএনপিকে জানিয়ে দিয়েছেন।
গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা জানান, বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষে ভারতে অবস্থানরত দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জামায়াতের বিষয়টি আমাদের অবহিত করেন। আমরা এ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করেছি। কারণ জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আদর্শগত কোনো মিল নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আমাদের আদর্শ কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনার সঙ্গে এক মঞ্চে উঠে আন্দোলন করতে পারে না।
ওই নেতা বলেন, আগে যুগপৎ ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যেসব দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামী ছিল না। জামায়াত যদি পৃথকভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন করে তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু এক মঞ্চে জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করতে আমাদের আপত্তি রয়েছে।
মঞ্চের নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপি চলমান আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে জামায়াতে ইসলামীসহ নির্বাচন বয়কট করা সব বিরোধী দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে বিশেষ করে জামায়াতকে নিয়ে আমাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। মঞ্চগতভাবে আলোচনা করে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানাব।’
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আমরা সরকার পদত্যাগের এক দফার যুগপৎ ঘরানার আন্দোলন নিয়ে রাজপথে আছি। ভবিষ্যতে রাজপথই নির্ধারণ করে দেবে আরও বৃহত্তর ঐক্যের জন্য কাদেরকে নিয়ে একসঙ্গে আন্দোলন হবে কিংবা হবে না।’
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীকে বাদ রেখেই গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো। প্রথম দিকে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে দুটি কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। কিন্তু এসব কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত নেতাকর্মীদের বিএনপির নেতারা দেখতে না-যাওয়া ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি না দেওয়ার অভিযোগ এনে পরবর্তীকালে যুগপৎ কর্মসূচি পালনে বিরত থাকে জামায়াতে ইসলামী। তবে গত ১২ জুলাই এক দফার আন্দোলন ঘোষিত হওয়ার পর বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে জামায়াত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাবন্দি দলটির নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শোক প্রকাশ দলটির কাছে আনে জামায়াতকে। একপর্যায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি কয়েক দফা কথাবার্তাও হয় তারেক রহমানের। এরই প্রেক্ষিতে বিএনপি ও তার মিত্রদের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের অনুরূপ কর্মসূচি দেয় জামায়াত। এরপর থেকেই বিএনপির সঙ্গে একই কর্মসূচি পালন করে আসছে জামায়াত।
তখন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছিলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কর্মসূচি প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং ঘোষণা করা হচ্ছে।’
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা এখন আগের তুলনায় বেড়েছে। বিএনপির পক্ষে বাম দলগুলোর সঙ্গে আন্দোলন বিষয়ে লিয়াজোঁ করার দায়িত্ব ছিল স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ওপর। গত মাসে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত নিয়ে ব্ক্তব্য দেওয়ার পর ‘এ বক্তব্য যে দলের নয়’ ব্যাখ্যা দিয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠান বিএনপির সিনিয়র যু্গ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এর পরই ইকবাল হাসান মাহমুদের পরিবর্তে লিয়াজোঁ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতে অবস্থানরত বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে।
বৃহত্তর আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের জানান, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্বাচনে না যাওয়া সব দল এক জায়গায় মিলিত হব। সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমেই বর্তমান সরকারের পতন নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে বৃহত্তর পরিসরে এক মঞ্চে জামায়াতকে রেখে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যেতে চায় না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন চলছে। তারা এখন নির্বাচনে না যাওয়া সব বিরোধী দলকে এক মঞ্চে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমাদেরকেও পাশে চায়। এ ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাদেরকে প্রস্তাবও দিয়েছে বিএনপি। অন্য দলের মতো ইসলামী আন্দোলনেরও একটা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর আমাদের দলের শুরার বৈঠক আছে। সেখানে আমরা বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব। সেখানেই রাজনীতি ও দেশের জন্য যেটা ভালো হবে, আমরা সেই সিদ্ধান্তই নেব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলনে রয়েছি। আপাতত এভাবেই আন্দোলন করে যাব। যদি এমন কোনো ক্ষেত্র তৈরি হয়, তখন আমাদের দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’