‘মায়ের কান্না’ আয়োজিত মানববন্ধন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:২৯ পিএম
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:০১ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মায়ের কান্না আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। প্রবা ফটো
যারা আমাদের গণতন্ত্র শিক্ষা দিতে চান তাদের অনেকের দেশেই গণতন্ত্র নেই বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও করে কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়নি। দেশে পরাজিত প্রার্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরাজয় মেনে নেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও পরাজয় মেনে নেয়নি। তাদের দেশে গণতন্ত্র নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে সংঘবদ্ধ করে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’
সোমবার (২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘মায়ের কান্না’ আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মানববন্ধনের আয়োজন করে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর জিয়াউর রহমান কর্তৃক নির্মম ফাঁসির শিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা ও বিমান বাহিনীর শহীদ সদস্যরা। তারা জিয়াউর রহমানের কবর সংসদ ভবন থেকে অপসারণের দাবি জানান।
এ সময় মানবাধিকার ও নির্বাচনের নামে দয়া করে কেউ আমাদের গণতন্ত্র শিক্ষা দেবেন না বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা অনেকের পছন্দ নয়। সেজন্য দেশকে নিয়ে নানান ষড়ষন্ত্র করছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের নামে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে বাইরের কিছু দেশ চেষ্টা করছে। আমি বলে দিচ্ছি, আমাদের দেশে অবশ্যই আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং জনগণের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হবে। সরকার সর্বোচ্চভাবে নির্বাচন কমিশনকে এটি করার জন্য সহযোগিতা করবে। দয়া করে আমাদের গণতন্ত্র শিক্ষা দেবেন না।’
মানবাধিকার নিয়ে ব্যবসা দেশে-বিদেশে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘কিছু কিছু সংগঠন আছে পৃথিবীতে, যারা মানবাধিকার নিয়ে ব্যবসা করে। তারা কাউকে কিল মারলে বিবৃতি দেয়, কাউকে ঘুষি মারলেও বিবৃতি দেয়। কিন্তু তাদের আত্মীয়-স্বজন কাউকে মেরে ফেললে কোনো বিবৃতি নাই। ২০১২-১৪ সালে যারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে, ফিলিস্তিনের শিশুরা যখন ঢিল ছুড়ে তার প্রতিবাদে ইসরায়েলের সৈন্যরা যখন পাখির মতো শিশুদের শিকার করে, তখন কোনো বিবৃতি নাই। অনুরোধ থাকবে মানবাধিকার ব্যবসাটা বন্ধ করুন। মায়ের কান্নার কান্না যখন আপনাদের কানে পৌঁছে না, তখন আপনারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন।’
তিনি বলেন, ২০১২-১৪ সালে কীভাবে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিরীহ মানুষ যারা রাজনীতি বুঝে না, রাজনীতি করে না, তাদের কীভাবে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়েছে। ক্লান্ত চালক-হেলপাররা যখন গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে ছিলেন, তারা যেন বাইরে বের হতে না পারে সেজন্য দরজায় তালা দিয়ে গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। গাড়িসহ ড্রাইভার ভাইয়েরা পুড়ে মারা গেছে। এরকম বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল। তখন কোথায় ছিল মানবাধিকার।
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাইরে থেকে মানুষ পোড়ানোর নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর বিদেশ বসে নির্দেশনা দিয়েছিল তারেক। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও মানুষকে খুন করে ক্ষমতায় বসেছিলেন। আসলে যাদের জন্ম রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, খুনের ওপর দাঁড়িয়ে, তাদের থেকে এর চেয়ে ভালো আর কী আশা করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান নাস্তা খেতে খেতে ফাঁসির আদেশে সই করতেন। তার প্রতিষ্ঠিত দল এভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে এটাই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়া দেশে মানবাধিকারের বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত করেছে। রাজনীতির নামে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়নি।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রধান সঙ্গী। তারা ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, বিএনপি তাদের রাজনৈতিক দল আখ্যা দিয়ে বৈঠক করেছে। যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, গত কয়েক বছর ধরে এই মায়ের কান্নার ব্যানারে যারা কেঁদে বেড়াচ্ছে সমগ্র দেশজুড়ে তাদের কান্না আপনাদের কর্ণ প্রহরে কেন পৌঁছায় না। মানবাধিকার এখন কিছু কিছু রাষ্ট্রে অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার ব্যবসা দেশ-বিদেশে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘বিএনপি কয়েক দিন যাবত বলছে, খালেদা জিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। খালেদা জিয়া যতবার হাসপাতালে গেছেন, ততবারই বলা হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন। বিদেশে না নিলে তিনি মারা যাবেন। কতবার তিনি হাসপাতাল থেকে ভালো হয়ে বাড়িতে ফেরত গেছেন। দেশে খালেদা জিয়ার যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত হয় সেজন্য সরকার যা কিছু করার তা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করবেন আর সেটা করতেও দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি বানিয়েছে। এতে করে মনে হয়েছে, তারা চায় না বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ হোক। তারা চায় বেগম খালেদা জিয়া আরও অসুস্থ থাকুক। তাহলে তারা তাকে নিয়ে নোংরা রাজনীতিটা আরও বেশি করে করতে পারবে। খালেদা জিয়ার দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সরকার তার জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটা সরকারের নয়, আদালতের। আদালতের অনুমতি ছাড়া তো তিনি বিদেশ যেতে পারবেন না। এ নিয়ে দয়া করে রাজনীতি করবেন না।’
মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী।
তিনি বলেন, ‘২ অক্টোবর বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি বেদনার দিন। কারণ জিয়াউর রহমান এবং খুনি মোস্তাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সেদিন বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরিচ্যুত ও কারা দণ্ডিত করা হয়। পরে নির্বিচারে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে ২ অক্টোবর যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল সেসব পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’
গুম খুনের রাজনীতি জিয়াউর রহমান প্রথম শুরু করেছেন এমন মন্তব্য করে সুজিত রায় নন্দী বলেন, ‘ভোট কারচুপির রাজনীতি তিনি শুরু করেছেন। হ্যাঁ-না ভোট কোন আমলে হয়েছিল? আজকে তারা গণতন্ত্রের কথা বলে! ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে হত্যা করার লক্ষ্যে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। সেদিন আইভী রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন কে হত্যা করা হয়েছিল। সেই দিন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তারেক রহমান। সেদিন বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পরিকল্পনাকারী ছিলেন জিয়াউর রহমান এবং একুশে আগস্ট শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের মাধ্যমে হত্যার পরিকল্পনাকারী ছিলেন তারেক রহমান।’
তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির বিচার আপনারা সবাই দেখেছেন। সেই দিন যদি জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত না থাকত তাহলে বাংলার মাটিতে জিয়াউর রহমানের এরকম করুণ পরিস্থিতি হতো না। জিয়াউর রহমান ৭৭ সালে বিনা বিচারে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের ফাঁসি দিয়েছিলেন।’
আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা কি বিএনপির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছেন এমন প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।
তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র কয়েকজনকে স্যাংশন দিয়েছে। আওয়ামী লীগের সংবাদ প্রকাশ করে এমন গণমাধ্যমগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে কি শুধুমাত্র বিএনপির খবর প্রকাশ করাই বাকস্বাধীনতা? আপনারা কি শুধুমাত্র বিএনপির পক্ষে কথা বলবেন? তাহলে আপনারা কি বিএনপির পৃষ্টপোষকতা করেন? আপনারা কি শুধুমাত্র বিএনপির মুখপাত্র?’
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করেছে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘তিনটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে বিএনপি এবং যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার স্বজনরা। এর মধ্যে একটির প্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছেলে। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে। সুতরাং লবিস্ট নিয়োগের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। মানবাধিকারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের জবাব একদিন দিতে হবে। একদিন তাদের মাটিতে তাদের দেশের মানবাধিকারের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলব।’
মায়ের কান্না সংগঠনের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান মিয়া লেলিনের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন কর্পোরাল নওরেজ ডি রোজারিও, সার্জেন্ট মোবারক আলীর মেয়ে মমতাজ বেগম, বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক, সার্জেন্ট আজিজুর রহমানের স্ত্রী সুফিয়া বেগম, সার্জেন্ট মো. হাবিবুর রহমানের ছেলে মো. সাইদুর রহমান প্রমুখ।