খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:১৩ পিএম
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছে বিএনপি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কোন দেশে পাওয়া যাবে সে ব্যাপারেও যোগাযোগ শুরু করেছে দলটি। এজন্য সম্ভাব্য চারটি দেশকে মাথায় রেখে জার্মানির ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখানো হচ্ছে।
খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তি দিতে বিএনপির পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামে সরকার সাড়া না দিলেও এরই মধ্যে পরিবারের পক্ষ থেকে নতুন করে আবেদন, বিদেশে যোগাযোগ এবং এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর ‘নরম সুর’ রাজনীতিতে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন খালেদা জিয়া। তাকে স্থায়ী মুক্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর জন্য গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফের আবেদন করেছেন তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার। আবেদনে তিনি খালেদা জিয়ার শারীরিক গুরুতর অবস্থা তুলে ধরে সব শর্ত শিথিল করে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। বিষয়টি জানাজানি হয় গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার জন্য অনুমতি চেয়ে করা আবেদনটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আবেদনটি দ্রুতই যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
এর আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিএনপির ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের পর আইনমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, আইনের আওতায় মুক্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুযোগ নিতে হলে কারাগারে গিয়ে নতুন করে আদালতে আবেদন করতে হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী মুক্তির ব্যাপারে আইনের প্রশ্ন তোলেননি। তিনি বলেছেন, ‘যাচাই-বাছাই করে স্বল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া’ হবে। এর পরই গুঞ্জন ওঠে খালেদা জিয়াকে ‘বিদেশে নেওয়া হচ্ছে’। ‘সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রচারণাও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ ব্যাপারে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবার কিংবা সরকার, কোনো পক্ষ থেকেই স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয়ে যখন আবেদনটি আসে, তখন বৃহস্পতিবার ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) ছুটিসহ তিন দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়। ছুটি শেষে আগামীকাল কর্মদিবস শুরু হলে এ ব্যাপারে সরকারের ‘ইতিবাচক’ সাড়া পাবে বলে আশাবাদী বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবার। যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তি দেওয়ার মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে। সফরসূচি অনুযায়ী আগামী ৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে কি নাÑ জানতে চাইলে শামীম ইস্কান্দার গতকাল শুক্রবার দুপুরে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখনও কোনো কিছু জানায়নি। আমরা অধীর আগ্রহে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’
গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় খালেদা জিয়া ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মেডিকেল বোর্ড অনেক দিন ধরে তার লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে আসছে। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘লিভার সিরোসিসের কারণে খালেদা জিয়ার হৃদযন্ত্র ও কিডনির জটিলতা বেড়েছে। তিনি হাসপাতালে কখনও কিছুটা ভালো থাকছেন, পরক্ষণেই স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। ফলে তাকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ না থাকায় তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি এখন সামনে এসেছে জোরালোভাবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৪ সেপ্টেম্বর সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন তাদের দলের চেয়ারপারসনকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিতে। মির্জা ফখরুল তখন বলেছিলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, আপনাদের কিছু করার থাকলে করেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। অবিলম্বে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দিতে না পারলে বাঁচানো দুষ্কর হবে’। এ আল্টিমেটাম সময়ের মধ্যেই ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে আবেদনও করেছে তার পরিবার।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে তার পরিবার। অনুমতি মিললেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী ইউরোপের জার্মানি, যুক্তরাজ্য বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এরই মধ্যে জার্মানি দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স (সিডিএ) জান রল্ফ জানোস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরকার অনুমতি দিলে জার্মানিতে চিকিৎসা সম্ভব বলে বিএনপি মহাসচিবকে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে গুঞ্জন রয়েছে, সরকার খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিলেও কিছু দেশের নাম উল্লেখ করে শর্ত দিতে চায়। সে ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা এশিয়ার কোনো দেশে চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু বিএনপি চায় জার্মানি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিএনপি চেয়ারপারসন আগে এসব দেশে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। তা ছাড়া তার শরীরে যেসব রোগ রয়েছে এবং তার শরীরের বর্তমান যে পরিস্থিতি তার উপযুক্ত চিকিৎসা উল্লিখিত তিনটি দেশে সম্ভব।
এ ছাড়াও, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তির ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ, বিদেশে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান না করাসহ আরও কিছু শর্ত সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে খালেদা জিয়া কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক শর্ত মেনে বিদেশে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নন পরিষ্কার করে দলের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকাল শুক্রবার রাতে গুলশানে অনুষ্ঠিত লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বিএনপির নেতারা গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের এ বিষয়টি জানান বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলেও সরকারের নির্বাহী আদেশে যেকোনো সময় এটা সম্ভব বলে মনে করছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহর সামনে নিয়ে আসছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিম ও প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম কারাদণ্ড মাথায় নিয়েই বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময়ে আ স ম আবদুর রবও বিশেষ অনুমতিতে বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল বলছেন ‘বিএনপি চেয়ারপাররসনকে যে আইন অনুযায়ী শর্তযুক্ত মুক্তি ছয় মাস করে দিচ্ছে সরকার, সেই আইন বলেই তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার সুযোগ আছে’। তিনি বলেন ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা সরকারের অজানা নয়। হাসপাতালে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আছে। সরকার সবকিছু জানে। আমরা আশা করি পরিবারের মানবিক আবেদনে সরকার দ্রুত সাড়া দেবে।’
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার এখনকার পরিস্থিতি জটিল বলেই হয়তো আইনমন্ত্রী ‘স্বল্প সময়ে’র কথাটি বলেছেন। সে কারণে এবার সরকারের কাছ থেকে ‘ইতিবাচক সিদ্ধান্ত’ আসবে বলে আশা করছেন দলটির অনেকে।
খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার গুঞ্জনের মধ্যে গতকাল শুক্রবার বিকালে কেবিন থেকে ফের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। রাত ৯টার পর আবার কেবিনে নিয়ে আসা হয়। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হলো। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, শারীরিক জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে বিকালে তাকে কেবিন থেকে সিসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। এর আগেও গত দুই সপ্তাহে খালেদা জিয়াকে দুই দফায় সিসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। গত ৯ আগস্ট থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন খালেদা জিয়া।
দুর্নীতির দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হন। দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদাকে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দিয়েছিল। এরপর ছয় মাস পরপর তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছে সরকার। সর্বশেষ ১২ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।