রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৩ ১১:২৯ এএম
সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। ছবি : সংগৃহীত
রাজশাহীর আওয়ামী লীগের চার সংসদ সদস্যের (এমপি) রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। মিনুর দাবি, এই চার এমপি আওয়ামী লীগের কেউ না হওয়ার পরেও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন, অথচ যারা আওয়ামী লীগ পরিবারের ও ত্যাগী, তারা মনোনয়ন পান না।
মিনুর সেই মন্তব্য এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। মিনু এমন সময় এই মন্তব্য করলেন যখন রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ দুই মেরুতে বিভক্ত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ মিনুর মন্তব্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে ছক আঁটতে শুরু করেছে। খোদ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই এই বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মিজানুর রহমান মিনু সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীকে ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে মন্তব্য করেন, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হককে তিনি ছাত্র শিবিরের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেন। রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি শাহরিয়ার আলমের বিষয়ে মিনু বলেন, শাহরিয়ার আলম ২০০৮ সালে প্রথমে বিএনপির কাছে মনোনয়ন চান, না পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যুক্ত হন।
এ ছাড়া রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। এই এমপিদের তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ বা শ্রমিক লীগ- কিছুই করতে দেখেননি।
মিনু বলেন, ‘রাজশাহীর-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। তাকে আমি দেখেছি রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠের স্টেজে কর্নেল ফারুকের পাশে অস্ত্র নিয়ে জনগণের দিকে তাক করা।’
মনসুরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডা. মনসুরকে তো আমি মনে করতাম বিএনপি করত। আমাদের মন্ত্রী কবির ভাইয়ের ড্রয়িংরুমে সব সময় বসে থাকত প্রমোশন আর ট্রান্সফারের জন্য। আমি জেলখানায় ঢুকে দেখি মনসুর জেলখানার ডাক্তার। জেলখানায় হাজতির সঙ্গে কী যে অন্যায় অত্যাচার করেছে। তারা বরদোয়া দিত। এখন দেখি মনসুরও আওয়ামী লীগের এমপি।’
শাহরিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আরেকজন হচ্ছে চারঘাটের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আরে ও আমার সঙ্গে তদবির করতে আসছিলÑ বিএনপি থেকে ভোট করবে। আমি বলেছি ব্যবসা করছ, ব্যবসা করো গা। এখানে এসো না।’
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসলে আওয়ামী লীগ একটা প্রচীন দল। সে দলে যারা ভালো, তারা নাই। এটি খুব খারাপ। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকতে হবে। সে যে দলেই হোক।’
এর আগে রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ রাজশাহী-১ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর বিষয়ে একাধিকবার দাবি করে বলেছেন, ফারুক চৌধুরী একসময় ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের যে চারজন এমপিকে নিয়ে মিনু মন্তব্য করেছেন তাদের মধ্যে ফারুক চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ফুপাতো ভাই। ডা. মনসুর ও ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক লিটনপন্থি এমপি হিসেবে পরিচিতি এবং ২০০৮ সালে শাহরিয়ার আলমের আওয়ামী লীগের মনোনয়নের ক্ষেত্রে লিটনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যা উভয় নেতাই বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন।
মিনুর বক্তব্য প্রসঙ্গে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু বলেন, এমপি এনামুল বা ফারুক চৌধুরীর বিষয়ে বলতে পারব না, তবে এমপি শাহরিয়ার আলম এমপি হওয়ার আগে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের জায়গা দেওয়া উচিত।
রাজশাহী-৪ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হককে ছাত্র শিবিরের সভাপতি বলায় মিনুর বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘মিজানুর রহমান মিনুর নামে জঙ্গি মদদদাতাসহ দুর্নীতির একাধিক মামলা রয়েছে। আমাদের নামে কোনো দুর্নীতির মামলা নাই। আমরা রাজনীতি করি দলকে তুলে ধরার জন্য, সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য। কে, কীভাবে রাজনীতিতে এসেছে আমরা সব জানি। এসব কথা তুলে ধরলে অনেকেই মুখ দেখাতে পারবে না। কোন কর্নেল ফারুকের সঙ্গে আমাকে দেখেছে, কবে দেখেছে- মিনু সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলতে পারবে না।’
রাজশাহী-৫ আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমান বিএনপি নেতা মিনুর মন্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা মন্তব্য করে বলেন, ‘১৯৬৮ সালে রাজশাহী মুসলিম হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন আমি চার আনা পয়সা দিয়ে ছাত্রলীগের সদস্য হই। তখন আমাদের শিক্ষক ছিলেন ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, আজিজুল ইসলাম ও মুজাফফর স্যার। তারা আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এ ছাড়া আমি ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিএমএর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্যানেলে নির্বাচন করেছি। আওয়ামী লীগ ঘরানার চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের ১১ বছর সভাপতি ছিলাম এবং বিএমএর সভাপতি ছিলাম ১৩ বছর। আমি আওয়ামী লীগ না করলে আমাদের সভাপতি কী এমপির মনোনয়ন দিতেন?’
তবে মিনুর বক্তব্য প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলেননি রাজশাহী-৬ আসনের এমপি শাহরিয়ার আলম।
মিজানুর রহমান মিনু তার দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘যা সত্য তাই বলেছি। এখানে এগুলো সবারই জানা।’