সাক্ষাৎকার
শাকিল ফারুক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৩ ১১:০৯ এএম
মোহাম্মদ এ আরাফাত
ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে কৌতূহল এখন দেশজুড়ে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠেয় এই উপনির্বাচনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীক নিয়ে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত; যিনি মোহাম্মদ এ আরাফাত নামে বেশি পরিচিত।
টেলিভিশন টকশোর পরিচিত মুখ আরাফাত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নীতি-কৌশল প্রণয়ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানা উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রথমবারের মতো নেমেছেন ভোটের মাঠে। সংসদ সদস্য পদে জয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে দিনরাত প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আগামী ১৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় এ উপনির্বাচনকেন্দ্রিক নানা বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন তিনি
প্রশ্ন : হুট করে উপনির্বাচনে প্রার্থী হলেন কী ভেবে? নিজের আগ্রহে নাকি হাইকমান্ডের নির্দেশে?
আরাফাত : উন্নয়নের গতির সঙ্গে যুক্ত হতেই আমি নির্বাচনে এসেছি। আমি মনোনয়ন নিয়ে এমপি হতে আসিনি। প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আমাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। দল থেকে এটা আমার জন্য একটা অ্যাসাইনমেন্ট। দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন আমি প্রার্থী হই, আমারও ইচ্ছা ছিল।
প্রশ্ন : এত দিন দলের প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী নীতি-কৌশল প্রণয়ের কাজ করেছেন। এবার নিজেই প্রার্থী হয়েছেন। রাজনীতির মাঠ আর মাঠের রাজনীতির মধ্যে কী পার্থক্য দেখছেন?
আরাফাত : প্রার্থী হয়ে এখন যে কাজগুলো করছি; আগেও এসব কাজ করেছি। কিন্তু প্রচারের বাইরে থেকে। তাই সেগুলো সেভাবে সামনে আসেনি। এখন প্রার্থী হওয়ার কারণে আমাকে সামনে থাকতে হচ্ছে, সাক্ষাৎকার দিতে হচ্ছে। আড়াল থেকে আমার জন্য কিন্তু আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও আমার মতোই খাটছেন, তাদের দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী কার্যক্রম আসলে একটি দলীয় প্রয়াসের অংশ (টিম ওয়ার্ক)। নীতি-কৌশল নির্ধারণের সময় আমাকে পুরো বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তা করতে হতো, এখনও করতে হয়। তবে প্রার্থী হওয়ার সুবাদে ঢাকা-১৭ আসনকেন্দ্রিক তথ্য-উপাত্তগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংগ্রহের এবং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে যা কাজে আসবে।
প্রশ্ন : এই উপনির্বাচনে আপনি ছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আরও ২১ জন। প্রার্থী হওয়ার পর তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন?
আরাফাত : সবাই ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করছেন, পরিশ্রম করছেন। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দারুণভাবে আমাকে সহযোগিতা করছেন। এই আসনে দীর্ঘকাল আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন না, সর্বশেষ নির্বাচনে যিনি নৌকার প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন; তিনিও বহু দিন অসুস্থ থাকায় এই আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অভিভাবকহীন ছিলেন। আমাকে পেয়ে তারা বেশ উজ্জীবিত।
প্রশ্ন : নির্বাচনী প্রচারে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
আরাফাত : প্রচণ্ড সাড়া পাচ্ছি। ঢাকা-১৭ আসনটিকে অভিজাত এলাকা বলে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। কারণ এই আসনের ৩ লাখ ২৫ হাজার ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪৬-৪৭ হাজার ভোটার অভিজাত এলাকার (গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন)। ভোটারদের বড় অংশই কিন্তু ভাষানটেক, মাটিকাটা, মানিকদী, কড়াইল আদর্শনগর, কালাচাঁদপুর, নর্দ্দা ও সাততলা বস্তি এলাকায়। এসব এলাকায় বসবাসকারী মধ্য ও নিম্নবিত্তের ভোটারদের ভোটেই এই এলাকার এমপি নির্বাচিত হন। এসব ভোটারের বেশিরভাগই কিন্তু বংশপরম্পরায় নৌকার ভোটার। তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভক্ত। আমার ধারণা, এই এলাকার শতভাগ মানুষ ভোট দিলে তার মধ্যে ৮০ ভাগ ভোট পড়ত নৌকায়।
প্রশ্ন : প্রচারে গিয়ে ভোটারদের কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন? নির্বাচিত হলে তাদের জন্য কী করবেন?
আরাফাত : একেক এলাকার চাহিদা আসলে একেক রকম। সব এলাকার সমস্যা এক রকম না, আলাদা আলাদা। সমস্যাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে সমাধান করতে হবে। ইতোমধ্যে আমি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।
প্রশ্ন : নির্বাচিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ মাসের মতো সময় পাবেন। এই অল্প সময়ে আদৌ কি খুব বেশি কিছু করা সম্ভব?
আরাফাত : আমি তো কাউকে কোনো মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছি না। তবে আমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আটকে থাকা কাজগুলো যতটুকু শেষ করা যায় সে চেষ্টা করব। আর পাঁচ মাস পরে যদি ফের সুযোগ পাই তাহলে কাজের ধারাবাহিকতা থাকবে। ভোটারদের কাছে গিয়ে এ কথাই বলছি।
প্রশ্ন : তার মানে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন?
আরাফাত : সেটা বলছি না, তবে আমি আশাবাদী। সুযোগ পেলে যে কাজ করে দেখাব, তাতেই এলাকাবাসী বুঝবে আমি কী করব, কী করতে চাই। কথা আছে না, সকালটা দেখে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে।
প্রশ্ন : ভোটের মাঠে আপনার সামনে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আপনিও বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও প্রতিপক্ষ রয়েছে। তারা কারা?
আরাফাত : মাত্র পাঁচ মাসের নির্বাচন হওয়ায় অনেকের মধ্যেই অনাগ্রহ থাকতে পারে। মানুষের আগ্রহ তৈরি করার চ্যালেঞ্জটাকেই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ভাবছি। সেখানেই ফোকাস রেখেছি। আর প্রতিপক্ষ তো সব সময় ছিলই। বিএনপি-জামায়াতই আমার মূল প্রতিপক্ষ। মূলত আমার না, আমাদের। বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি আমাদের মূল প্রতিপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই করে যেতে হচ্ছে। তারা বারবার প্রমাণ করতে চাইছে, আওয়ামী লীগের আমলে দেশে গণতন্ত্র নেই, নির্বাচন নেই। এমন প্রেক্ষাপটে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়াই আমাদের চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন : তাহলে দলীয়ভাবে আপনাদের অগ্রাধিকার কোন বিষয়ে, ভোট সুষ্ঠু করা নাকি প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করা?
আরাফাত : অগ্রাধিকার সবকিছুতেই। তিনটি বিষয় সামাল দিতে পারলে নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিজয়ী ভাবতে পারব। প্রথমত নির্বাচনে জয়ী হতে হবে, দ্বিতীয়ত যথেষ্ট পরিমাণ ভোটারকে কেন্দ্রে আনা এবং তৃতীয়ত একটি বিতর্কমুক্ত সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়া।
প্রশ্ন : আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতার কেন্দ্রে এখন বাংলাদেশ। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের আনাগোনা বাড়ছে। এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে আলাদা করে কোনো চাপ অনুভব করছেন কি না?
আরাফাত : একদমই না। আমি তো খুশি। গোটা দুনিয়া আসুক। ওরা আসছেন কারণ আমরা আমাদের দরজা খোলা রেখেছি। গোটা দুনিয়া এসে যদি দেখে, দেশে ভালো নির্বাচন হয়, তাহলে দেশের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা যে কাজটা করতে চায় সেটা পারবে না। আমাদের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু আমরা তাদের (বিদেশি কূটনীতিকদের) বলেছি, তোমাদেরও নিরপেক্ষ হতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লোক নিয়োগ দিলে হবে না, যারা পর্যবেক্ষণের নামে ষড়যন্ত্র করবে। এগুলো চলবে না।
প্রশ্ন : নির্বাচনী প্রচারে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই প্রার্থীর অভিযোগ, আপনার লোকজন হামলা চালিয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আপনার বিরুদ্ধে একটি বিদেশি দূতাবাসে অভিযোগও করেছেন।
আরাফাত : ঢাকা-১৭ আসনে নৌকার প্রচুর ভোট। সবাই কেন্দ্রে এলে নৌকার ভোটের জোয়ার বয়ে যাবে। আমাদের ফোকাস ভোটারদের কেন্দ্রে আনা। আমরা চাচ্ছি পরিবেশটা যেন সুন্দর থাকে। পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলে আমাদের জন্যই ভালো। দলের নেতাকর্মী-সমর্থক সবাইকে বলা আছে কোনোভাবেই যেন বিশৃঙ্খলতা তৈরি না হয়। এটা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলা আছে। পরিবেশ বিনষ্ট হলে আমার কী লাভ? সুন্দর থাকলেই আমার লাভ। যারা বিতর্ক তৈরি করতে চায় তাদের হয়তো লাভ আছে। তারা আলোচনায় আসতে চায়।
প্রশ্ন : যেহেতু আপনার নামে অভিযোগ তুলেছেন, আক্রান্ত ওই প্রার্থীর তো ফোন করে হলেও খোঁজ নিতে পারতেন। রাজনীতিতে এতটুকু সৌহার্দ্য কি দেখানো যেত না?
আরাফাত : বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নজন ধাক্কাধাক্কি করবে, তাদের তো ফোন করে বলার কিছু নেই। সবাইকে যদি ফোন করে করে বোঝাতে হয়, তাহলে তো আসল কাজে ফোকাস রাখতে পারবো না। সবাইকে এই বার্তা দেওয়া আছে যে সহনশীল থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
প্রশ্ন : ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
আরাফাত : ভোটকেন্দ্র খোঁজা, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা বাড়ি থেকে কেন্দ্রে আসার ব্যাপারে অনীহার কারণে অনেকে ভোট দেন না। শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে সংকট অন্যরকম। ভোট দিতে এলে হয়তো অনেকে তাদের সারা দিনের কাজ করতে পারেন না। অনেকে এই নির্বাচনী এলাকার ভোটার, কিন্তু কাজ করেন অন্য এলাকায়। ভোটগ্রহণের দিন নির্বাচনী এলাকায় ছুটি থাকলেও অন্য এলাকায় তো সেই সুবিধা থাকে না। এমন নানা বিড়ম্বনার কারণে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়। উপনির্বাচনে তা আরও কমে যায় ধারণাগত কারণে। অনেকে মনে করেন ডানে আওয়ামী লীগ, বামে আওয়ামী লীগ। প্রার্থী তো এমনিতেই বিজয়ী হবেন। তাহলে কষ্ট করে ভোট দিতে যাওয়ার কী দরকার। আবার আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াত দেখাতে চায় নির্বাচন হচ্ছে না, ভোটাররা আসছেন না নির্বাচনে। আমরা চেষ্টা করছি ভোটারদের কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার বিষয়টি সহজ করতে। প্রত্যেক দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দৌড়াচ্ছি। একটা পরিচ্ছন্ন নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য, ভোটারদের উৎসাহিত করার জন্য নির্বাচনী আচরণবিধির মধ্যে থেকে সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
শ্রুতিলিখন : সাজ্জাদুল ইসলাম