এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১০:০৩ এএম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:০৮ এএম
প্রবা অলঙ্করণ
ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে ভিডিওধারণ, প্রভোস্ট অফিস ভাঙচুর, প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজিসহ নানা কাণ্ডে জড়ালেও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। গত ৯ জানুয়ারি সংগঠনটির ১৭ নেতাকর্মীসহ ১৮ জনকে বহিষ্কার করার পর বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে।
বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) বিকালে ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রেসিডেন্স হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন কমিটি। সামগ্রিক বিশ্লেষণে কমিটির পর্যবেক্ষণ বলছে, ছয়টি ঘটনা খুবই অল্প সময়ে ঘটেছে। গত বছর ১৭ জুলাই সন্ধ্যারাতে খাবার খেয়ে ক্যাম্পাসের সড়ক ধরে হলে ফিরছিলেন দুই ছাত্রী। তাদের বিবস্ত্র করে ভিড়িও ধারণ করা হয়। সে ঘটনায় এক ছাত্রীর মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজনই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তারা এখনও কারাগারে রয়েছেন। এই ছাত্রীদের অভিযোগ, তাদের মামলা করতে বাধা দেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আদুভাই খ্যাত রেজাউল হক রুবেল। ভয়ে তারা অভিযোগ রুবেলের নাম দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মৌখিক অভিযোগ পেয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ওই সময় রুবেলকে শোকজ করেছিল। পরে ঢাকায় গিয়ে রুবেল তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার দায় থেকে নিজকে রক্ষা করেন। তবে সে সময় রুবেল দাবি করেন, ‘ছাত্রীকে বাধা দেওয়া দূরে থাক, বরং অভিযোগ দিতে সহযোগিতা করেছিলাম।’
সে সময় ক্যাম্পাস আন্দোলনে উত্তাল হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। তার পরও ছাত্রলীগ শৃঙ্খলায় ফেরেনি। ভিডিও ধারণের কয়েক সপ্তাহ পর আরও কয়েকটি কাণ্ডে জড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। সাংবাদিককে মারধর, প্রভোস্ট অফিস ভাঙচুর, প্রভোস্টকে টেলিফোনে হুমকি, কর্মচারীদের লাঞ্ছিত করা, ধারালো অস্ত্র হাতে দফায় দফায় সংঘাতে জড়ানো, শাটল ট্রেনে নাশকতার পরিকল্পনা প্রভৃতি। ছয়টি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তদন্ত শেষে গত সোমবার বোর্ড অব রেসিডেন্স হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন কমিটির অনলাইন সভায় যোগ দেন উপাচার্য শিরীণ আখতার, উপ-উপাচার্য বেণু কুমার দে, প্রক্টরসহ সংশ্লিষ্টরা। সেই সভায় ১৮ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের মধ্যে ১৭ জনই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যজন আছেন গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে।
শিক্ষার্থীরা জানান, যৌন হেনস্থাসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেও তারা শিক্ষাজীবন শেষ করার স্বার্থে পারতপক্ষে অভিযোগ দেন না। এসব ছাড়াও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে নানা ধরনের নৈরাজ্যকর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যেমন সাধারণ ছাত্রদের হলে ঠাঁই হয় না। বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও হল দখল করে আছেন ছাত্রলীগের নেতারা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে পছন্দের শিক্ষার্থীকে হলে থাকতে দেওয়া হয় বলে ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
শান্তির ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা বহিষ্কার হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিকে অনুরোধ জানানো হবে।’ তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কমিটি কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না। শুধু সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠাতে পারে। এখন সেটা করব। এখনও কেন পাঠানো হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি তিনি। ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে পাঠানো হয়নি।
২ হাজার ১০০ একর আয়তনের বিশবিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক আছে ২৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে রাতে আবাসিক হল ও শিক্ষক আবাসিক এলাকায় বাস করেন প্রায় ছয় হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ফাঁড়িতে পুলিশ সদস্য থাকেন মাত্র ১৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ সব সড়কে পর্যাপ্ত বাতি স্থাপন করেনি। যেগুলো আছে সেগুলো জরাজীর্ণ। এ ছাড়া পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানা হলেও অনেক জায়গায় তা নেই। ভঙ্গুর নিরাত্তাব্যবস্থার কারণে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ছাত্রীকে যৌননিপীড়নের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ আসামি এখনও কারাগারে আছেন। মামলাটি তদন্ত পর্যায়ে আছে। এ ছাড়া ২০২২ সালে সাত-আটটি মামলা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে এখন ১০০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই মাসে সিসিটিভি ক্যামেরা কম ছিল। এখন কিছু বাড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।