ওয়ান ইলেভেন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:৩৪ পিএম
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৩ ২১:১৫ পিএম
ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
২০০৭ সাল। সাংবিধানিক সংকটের দোহাই দিয়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেষ্টা করছিল ওই বছরের ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের। দেশের প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল বর্জন করে এ নির্বাচন। দেশ তখন এগিয়ে যাচ্ছিল কার্যত একদলীয় নির্বাচনের দিকে।
ওই সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের বর্ণনা মতে, সেনাবাহিনী এই কাজে সহায়তা করছিল ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘ নির্বাচন আয়োজনে সেনাবাহিনীর এই সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে তখন জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।এমন প্রেক্ষাপটে দেশে আসে ওয়ান-ইলেভেন।
ওয়ান-ইলেভেন সম্পর্কে জেনারেল মইন উ আহমেদ নিজের ভাষ্য তুলে ধরেছেন ‘শান্তির স্বপ্নে’ শীর্ষক বইটিতে। ওয়ান-ইলেভেনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের অবসান ঘটার পর তিনি বিদেশ চলে যান এবং পরে আর দেশে ফিরে আসেননি। এ কারণে জেনারেল মইন যা-ই বলুন না কেন, তার ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহ-সংশয় রয়েছে এবং তার দেওয়া ভাষ্য সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ এবং ওই সময়ের সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ বিভিন্ন উপদেষ্টা কোথায় আছেন, কী করছেন, কেন আর দেশে আসেন না, এসব নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকের ধারণা, আইনি ঝামেলা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য তারা প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন।
কে এখন কোথায় আছেন
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার ওয়ান-ইলেভেনের মধ্য দিয়ে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানায়। এরপর এই সরকারে যুক্ত সবাই একে একে দেশত্যাগ করেন।
এদের মধ্যে ফখরুদ্দীন আহমেদ ও মইন উ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানেই আছেন। সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারীও আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। সে সময়ের প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী টানা ছয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। এখন তিনি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য।
ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তা হিসেবে দোর্দণ্ড প্রতাপে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। তিনি কয়েক বছর ধরে দুবাইয়ে চাকরি করছেন।
বিভিন্ন সূত্রমতে, তিনি ও ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন। চাকরিচ্যুত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে।
সেনাপ্রধানের বর্ণনায় ওয়ান-ইলেভেন
জেনারেল মইন তার ‘শান্তির স্বপ্নে’ শীর্ষক বইটিতে ১১ জানুয়ারি দিনটি শুরুর বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘সেদিন ফজরের নামাজ পড়ে ও মোনাজাত শেষ করে তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে চলে গিয়েছিলেন।
এ সময় তাকে জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মি. গুইহিনো টেলিফোন করে কোনোরকম ভণিতা না করেই জানান, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতিত নির্বাচন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ রকম নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করার ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’
জেনারেল মইন এই বইতে আরও জানান, এর আগের দিন ১০ জানুয়ারি সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী কাজে সম্পৃক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেনাবাহিনী আগে থেকেই জেলা পর্যায়ে মোতায়েন ছিল। এ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের দায়িত্বের পরিধি আরও বাড়ানো হয়, নির্বাচনী কাজে বাধা সৃষ্টিকারীদের কোনো পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে।
এই প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে মইন উ আহমেদ মন্তব্য করেছেন, প্রজ্ঞাপনের এ নির্দেশের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে যেন জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জেনারেল মইন লিখেছেন, ‘দেশের বাইর ও ভেতর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এ প্রক্রিয়া স্থগিত করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হলো। আমি বুঝতে পারছিলাম সেনাবাহিনীর মনোভাবও প্রায়ই একই রকম। গোয়েন্দা সূত্র আমাকে নিশ্চিত করল সেনাবাহিনীর সব পদবির সদস্যরাও এ ধরনের একটি নির্বাচনে সংযুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে।’
সেনাপ্রধানের বর্ণনামতে, ওইদিন বিকালেও জাতিসংঘ থেকে শান্তি মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মি. জন মেরি গুইহিনো তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন।
তাই পরদিন তিনি আবারও টেলিফোন করায় জেনারেল মইন ধারণা করেন, শান্তিরক্ষা মিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা সত্যিও হতে পারে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত এবং দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও তাকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা পরামর্শ দেন বলে তিনি উল্লেখ করেন বইটিতে। তবে সেখানে কারও নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা ছাড়াও ওয়ান-ইলেভেনের অনেক কুশীলব ছিল, যারা এখনও আড়ালেই রয়ে গেছেন।
বঙ্গভবনে যা ঘটেছিল
ওয়ান-ইলেভেনের দিন বঙ্গভবনের ভেতরে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে কী হয়েছিল, সে বিষয়ে নানাজন নানা রকম তথ্য দিয়েছেন।
তবে জেনারেল মইনের ভাষ্যমতে, ‘নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর বিকাল চারটায় বঙ্গভবনের ভেতরের বার ঘরে আমাদের ডাক পড়ল। ... মহামান্য প্রেসিডেন্ট পূর্ব থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই প্রেসিডেন্টকে স্যালুট করে তাঁর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। তারপর শুরু হলো আলোচনা। আমি প্রেসিডেন্টকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের আলটিমেটাম, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের অবস্থান বিশেষ করে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানালাম। জাতিসংঘ মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হলে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে তা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানও নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হলেন। ডিজিএফআই-এর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অগ্রসর হলে দেশ যে ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হতে পারে তার বর্ণনা দিলেন। দেশকে এ মহাসংকটের হাত থেকে রক্ষা করতে কিছু করার জন্য সবিনয় অনুরোধ জানালাম। আলোচনার মাধ্যমেই বের হয়ে এলো সংকট হতে উত্তরণের পথ।’
‘শান্তির স্বপ্নে’ বইতে তিনি লিখেছেন, সেদিন নিরস্ত্র অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে না এলে কী করতে হবে তাও সেকেন্ড ইন কমান্ডকে বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি কি সত্যিই তার জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?
সেদিন বঙ্গভবনের বাইরে যেসব সাংবাদিক দুপুর থেকে অপেক্ষা করছিলেন, তাদের একজনের ভাষ্যমতে, সেদিন দুপুর থেকেই সেনাবাহিনীর তৎপরতা ছিল বঙ্গভবন ঘিরে। তিন বাহিনীর প্রধানের বঙ্গভবনে প্রবেশের আগে থেকে সেনাবাহিনী বঙ্গভবনের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাঁজোয়া যান ছিল। তিন বাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে অবস্থানের সময়েই জরুরি অবস্থা জারির খবর প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতার। ফলে বঙ্গবভবনে বসে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনাতেই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, না কি এটি জারির সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রাখা হয়েছিল, সেটি বলা কঠিন।