বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:২৫ এএম
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:৩৫ পিএম
দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বাঁক বদলের বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ আজ। গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। পদত্যাগ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে। ওই পদে নিযুক্ত হন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। যার নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকার শপথ নেয় ১২ জানুয়ারি।
তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ পূর্ণ সমর্থন জানান নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি। ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও এ সরকার সেনাসমর্থিত সরকার হিসেবে পরিচিতি পায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সামনে আসে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের নাম।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রথম সেনা হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এরপর সেনাবাহিনীতে একাধিক ক্যু হয়েছে। তবে সামরিক ক্যু’র মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন প্রথমে জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং পরে লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কিন্তু সেনাসমর্থিত সরকার গঠনের ঘটনা ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনেই প্রথম। দেশের মানুষের কাছে এ ধরনের সরকারের শাসনামলে বসবাসের অভিজ্ঞতাও সেই প্রথম। অবশ্য এ ধরনের সরকার গঠনের ঘটনা আর ঘটেনি।
সংবিধান অনুযায়ী তখন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি না করে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। এর ফলে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা ও সন্দেহ দেখা দেয়। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। এ সময় আওয়ামী লীগ নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার দাবিতে আন্দোলনে নামে। বিএনপি-জামায়াতও পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। এতে দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা এবং অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এরই মধ্যে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সুলতানা কামাল, সিএম শফি সামি এবং হাসান মশহুদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন। ফলে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ বঙ্গভবনে যান এবং তার উপস্থিতিতেই রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ ও সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। সেদিনের বঙ্গভবনের ঘটনা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামল নিয়ে মইন উ আহমেদ পরে ‘শান্তির স্বপ্নে’ নামে একটি বই লেখেন। ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি এতে লিখেছেন, ‘আমি জানতাম ইতোপূর্বে উপদেষ্টা পরিষদের অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অজানা কোনো কারণে ও প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার কারণে আমরা কোনো দুষ্টচক্রকে আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না।’
কেন সে সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে নানা তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কারও কারও মতে, তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেনাসমর্থিত এ ধরনের একটি সরকারের বিকল্প ছিল না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তখনকার ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংকীর্ণ রাজনীতির পরিণতিই এই সরকার। সেই সংকীর্ণ রাজনীতির চর্চা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে ১১ জানুয়ারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান সংশোধন করে এর ৭ নং অনুচ্ছেদের পর ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধানবহির্ভূত পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করে। এই পদক্ষেপ ব্যাপক প্রশংসা পায়।
১১ জানুয়ারির সরকার ও রাজনীতি নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেন সরকার রাজনীতি বন্ধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু জনসমর্থন পায়নি। ওয়ান-ইলেভেন যারা করেছিলেন, তারা নিজেদের অনেক জ্ঞানীগুণী মনে করলেও একটা পর্যায়ে তাদের হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। কিন্তু রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথ তারা আটকাতে পারেনি। অনেক ডক্টরেট ডিগ্রি থাকলেও বিরাজনীতিকরণের পন্থা বাস্তবে কোনো কাজে আসে না, সে সময় তা প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ এই প্রক্রিয়াকে এবং তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়ান-ইলেভেন ইতিহাসে কালো দিন হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।’
ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিণতি ওয়ান-ইলেভেন। যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অবাধ লুটপাট করার রাজনীতিতে ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক ধারা যতদিন চলমান থাকবে, ততদিন যেকোনো সময়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সে সময় অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন সরকার অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অচলাবস্থার সমাধানের জন্য সম্ভবত তখন আর কোনো উপায় ছিল না। অনেকেই সেদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাস্তবতা মেনে নিয়েছিল এবং স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় তখন সামরিক বাহিনীর ভূমিকা কাম্য ছিল। এই ভূমিকা তখনও কাম্য ছিল না, এখনও কাম্য হতে পারে না। আমি নিশ্চিত, আমাদের রাজনীতিতে ২০০৭ সালের জানুয়ারির মতো অচলাবস্থা আর কখনও হবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেন যেন আর না আসে, তা নিশ্চিত করতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে ওই ধরনের পরিস্থিতি আর হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এখন কর্তৃত্ববাদী সরকার বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আছে। দেশটা ওই ওয়ান-ইলেভেনের মতোই চলছে।’ তিনি বর্তমান সরকারকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সহযোগী শক্তি হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
১১ জানুয়ারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমানসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেককেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গ্রেপ্তার করা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে স্থাপিত বিশেষ আদালতে গ্রেপ্তারকৃতদের বিচার চলে। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতর ‘সংস্কারপন্থি’ নামে একটি অংশ সৃষ্টির কৌশলও নেয় ওয়ান ইলেভেন সরকার। ‘মাইনাস টু থিওরি’ নামের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগে এবং খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বিএনপিতে নতুন নেতৃত্ব গঠন। এ সময় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টাও শুরু হয়। তবে তৎকালীন সরকারের সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয় ও সরকার গঠন করে।