প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২২ ২১:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২ ২১:৪৭ পিএম
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। ছবি: সংগৃহীত
আবারও বেফাঁস মন্তব্য করে তোপের মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বেশ খোলামেলাভাবেই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে তিনি ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা করার জন্যও ভারত সরকারকে বলে এসেছেন।
তিনি যখন চট্টগ্রামে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তখন তার আগের একটি মন্তব্যের প্রতিবাদে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সেই অবস্থার মধ্যেই তিনি এবার এমন মন্তব্য করলেন, যা বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তো বটেই, সরকারের জন্যও অত্যন্ত বিব্রতকর।
এর কয়েকদিন আগে সিলেটের এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ‘দেশের মানুষ এখন বেহেশতে আছে।’ তিনি যেদিন এ কথা বলেন, তার এক দিন আগেই দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে বাড়ানো হয়। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারের পারদ তো ঊর্ধ্বমুখী ছিলই। অবশ্য বেফাঁস মন্তব্যের রেকর্ড পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরও আছে। তিনি বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বলে তুলনা করেছিলেন। সে সময়ও তার মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচিত মন্তব্যের জের ধরে কদিন আগেই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মন্ত্রী-এমপিদের সংযত হয়ে বক্তব্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু মোমেন সেই নির্দেশনা হয়তো কানে তোলেননি। তবে তার এবারের বক্তব্য সরকার এবং দলের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অহেতুক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। শুক্রবার পলাশীর মোড়ে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে কাদের বলেন, ‘ভারত আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু। কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকতে কখনই ভারতকে অনুরোধ করেনি আওয়ামী লীগ। কাউকে অনুরোধ করার জন্য দায়িত্বও দেয়নি। যিনি বলেছেন, এটা তার ব্যক্তিগত মত হতে পারে, কোনোভাবেই দলের কিংবা সরকারের নয়। তাকে অনুরোধ করব, অহেতুক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন বিরোধী দলের নেতারা। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির সিনিয়র কয়েকজন নেতা।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় ফখরুল বলেন, ‘জানতে চাই এই সরকারের কাছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এবং ভারত সরকারের কাছেও যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সেই কথার অর্থ কী? তাতে কি এটা দাঁড়ায়- এ সরকার টিকে আছে ভারতের আনুকূল্যে? মানুষ জানতে চায়। এটা অত্যন্ত জরুরি কথা।’ সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘তারা (আওয়ামী লীগ) এমন সব মানুষকে মন্ত্রী বানিয়েছে যে, তারা কখন কী বলেন তা নিজেরাও জানেন না।’
প্রেস ক্লাবে অন্য এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতকে বলেছেন আওয়ামী লীগকে সরকারে রাখতে। অর্থাৎ ভারত তাদের রাখবে কী না, এটা নিয়ে সংশয় আছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য দেশের সার্বভৌমত্বের দৈন্যদশা তুলে ধরেছে। তার এমন বক্তব্য প্রমাণ করে দেশে অরাজকতা চলছে। শুধু মন্ত্রীরা নন, আমলারাও যে ভাষায় কথা বলছেন তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যের তালিকাও তৈরি করেছেন। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এ প্রসঙ্গে তার পোস্টে লিখেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে ড. মোমেনের যথাযথ ধারণা নেই। তিনি বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বড় হননি। যে কারণে দেশের মানুষের কষ্ট, আবেগ-অনুভূতি-এমনকি কূটনীতিও বোঝেন না।
কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে মোমেনের এ বক্তব্য নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি কেউ। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, একজন ব্যক্তির কথায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ভর করে না। তবে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন কোনো বক্তব্য আসা উচিত নয়, যা বিতর্ক এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার দুপুরে শোকাবহ আগস্ট উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন।
এ সময় তার বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে সবার বাকস্বাধীনতা রয়েছে। তাই সবাই সব কথা বলতে পারেন। তবে বক্তব্য অন্যভাবে উপস্থাপন হলে দুঃখ লাগে। তিনি মিডিয়াকে একটু ‘সহনশীল’ হওয়ার অনুরোধ জানান।
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) আমি বলেছি, শেখ হাসিনা আছেন বলেই আমাদের দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে। অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুললে সবার মঙ্গল হবে। আর এদেশে যত নাগরিক আছে, সে যেকোনো ধর্মের হোক-সবার সমান অধিকার। শেখ হাসিনা যদি সরকারে থাকেন তাহলে স্থিতিশীলতা থাকে। আর স্থিতিশীলতা থাকলেই আমাদের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে।’
প্রবা/আরএম/