জয়ন্ত সাহা
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:৫৭ পিএম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:০১ পিএম
মসিউর রহমান রাঙ্গা। ফাইল ফটো
বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের বলি হলেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। রওশনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জিএম কাদেরের রোষানলে পড়ে দলের সব পদ হারান তিনি। দল থেকেও বহিষ্কৃত হন।
সম্প্রতি কাদের-রওশন সমঝোতা হলেও দলে আর ফিরতে পারেননি রাঙ্গা। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে রওশনকে বহাল রাখতে সবচেয়ে সরব ছিলেন রাঙ্গা। কিন্তু রওশন এখন পর্যন্ত তাকে দলে ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেননি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, রাঙ্গা এখন কোথায় যাবেন?
জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশায় বহুবার প্রকাশ্যে ও অন্তরালে বিরোধে জড়িয়েছেন দুজন। এরশাদপত্নী রওশন ও ভাই জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব জাপায় দেবর-ভাবির দ্বন্দ্ব বলে পরিচিত। এরশাদের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে দুজনের দ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে আসে। তখন জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান ও রওশন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন- মর্মে দুপক্ষের সমঝোতা হয়। এভাবেই চলছিল জাপার কার্যক্রম।কিন্তু রওশন এরশাদ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার পরপরই পাল্টে যায় চিত্র। রওশনকে সরিয়ে জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ দেওয়ার জন্য জাপার এমপিরা স্পিকারকে চিঠি দেন। ওই চিঠি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে দেবর-ভাবির পুরোনো দ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে আসে। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা রওশনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেন। এরপরই জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। বহিষ্কার হয়ে কয়েকদিন জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে সভা-সেমিনারে সরব থাকলেও পরে রাঙ্গা অনেকটাই নীরব হয়ে যান। এর মধ্যেই চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন রওশন।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বরফ গলে দেবর-ভাবির সম্পর্কের। সর্বশেষ ১ জানুয়ারি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে মঞ্চে পাশাপাশি বসে দুজনই দলে ঐক্যের বার্তা দেন। এরপরই ব্যাকফুটে যান রাঙ্গা। রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত রাঙ্গাসহ যে দুজন নেতা দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী মামুনুর রশীদকে দলে ফিরিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। রাঙ্গা ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউল হক মৃধার বিষয়ে এখনও সুরাহা হয়নি।
দলের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রওশন-কাদেরের মধ্যে সমঝোতার পর রাঙ্গা ও জিয়াউল মৃধা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতার পদে রাখতে গিয়ে রাঙ্গা বিপদে পড়েছেন। কিন্তু রওশন পদে বহাল থাকলেও রাঙ্গাকে ফেরাতে তিনি এখনও কোনো উদ্যোগ নেননি। তবে বিরোধীদলীয় হুইপ পদে রাঙ্গা এখনও বহাল আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাকে দল থেকে বের করে দিয়েছেন জিএম কাদের। তার কাছ থেকে ডাক আসবে তা আমি প্রত্যাশা করি না। রওশন ম্যাডামের কাছে প্রত্যাশা আছে। কিন্তু তিনি এখনও ডাকেননি আমাকে।’
মসিউর রহমান রাঙ্গা আরও বলেন, ‘সব সময় বলে এসেছি, আমি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দল করি, সেটা করে যাব। তার মানে এই নয় যে, জাতীয় পার্টিই আমাকে করতে হবে। আমি নেতার আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করব।’
রাঙ্গার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য অনেক নেতাকেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা পরে কিন্তু মাফ চেয়ে দলে ফিরেও এসেছেন। কিন্তু রাঙ্গা দল থেকে বের হয়ে দলকে নিয়ে, চেয়ারম্যানকে নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন, তা ক্ষমার অযোগ্য। সুতরাং তার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’
তবে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় থেকেই তো দলে এই বহিষ্কার ও ফিরে আসার নানা কাণ্ড ঘটে আসছে। রাঙ্গা দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। হয়তো কোনো এক সময় তাকে আবারও জিএম কাদেরের পাশে দেখা যাবে। জাতীয় পার্টিতে কোনো শেষ কথা নেই।’