বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
সংসদ অধিবেশন। ফাইল ছবি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের নেতা ও ‘মাস্টারমাইন্ড’ কেÑ এই প্রশ্নে জাতীয় সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তুলে ধরেছেন সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের নায়ক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জামায়াত বলেছে, এ আন্দোলনের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই। এর কৃতিত্ব বাংলাদেশের জনগণ ও তরুণদের।
জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম কার্যদিবসে রবিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে দুই দফা বিতর্ক হয়।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তারেক রহমান দূর থেকে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতার আগের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি দাবি করেন, তারেক রহমানই আন্দোলনের প্রধান নায়ক।
পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড নেই। তার ভাষায়, এই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ ও দেশের যুবসমাজের।
দুপুরের বিরতির পর অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক বিষয়টি আবারও উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ডা. শফিকুর রহমান নিজেই অতীতে এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে জুলাই আন্দোলনের ‘মহানায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাই প্রতিমন্ত্রী মিল্লাতের বক্তব্য সঠিক এবং তা সংসদের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটি ২০২৪ সালের আগস্টের পর নয়; তারও আগে একটি ইফতার মাহফিলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং তখন যাদের ভূমিকা ছিল, তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ড. ইউনূস বিদেশ সফরে একজনকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করলে তিনিই প্রথম এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, আগেও বলেছি, এখনও বলছিÑ এই আন্দোলনের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই।
সকালে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে এবং সে কারণেই তিনি তাকে (তারেক রহমান) আন্দোলনের প্রধান নায়ক বলে মনে করেন। তার বক্তব্যের পরই বিষয়টি নিয়ে সংসদে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়।
২৩,৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, এ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মোট ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেসব হয়রানিমূলক মামলা এখনও প্রত্যাহার হয়নি, সেগুলো নিয়ে কমিটি কাজ করছে। রবিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান তিনি।
সরকারি দলের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা করা হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা সম্ভব নয় এবং এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় হতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে জামায়াতের নেতাকর্মীদের নামে কতটি মামলা হয়েছেÑ সে-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীনের প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদকে জানান, সারা দেশে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে শূন্যপদ পূরণের জন্য ইতোমধ্যে ৬ মাস, এক বছর এবং ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে ৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করা হবে।
অবসর সুবিধার ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পেয়ে থাকেন। ২০২৩ হতে ২১-জুন, ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ প্রয়োজন।
নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধান : স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে সরকার বিভিন্ন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন এবং ভাড়াভিত্তিক আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব
সরকারকে বর্তমানে প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি দাবি করেন, এতে ঘরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরবে, ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়বে এবং কালো টাকার প্রবাহ কমানো সম্ভব হবে।
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রবিবার প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেকে ব্যাংকে না রেখে ঘরে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছেন। আবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুযোগ দেয়, তাহলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে। বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক রয়েছে। এমপি বা রাজনৈতিক নেতা হলেই ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।