যুবদলের কমিটি
নতুন কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে জাতীয়তাবাদী যুবদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। ছবি: সংগৃহীত
আংশিক কমিটি ঘোষণার প্রায় দুই বছর পর জাতীয়তাবাদী যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নতুন এ কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। কমিটিতে স্থান পাওয়া নেতা ও তাদের সমর্থকরা আনন্দ মিছিল করছেন, সামাজিক মাধ্যমে আনন্দঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। কিন্তু স্থান না পাওয়া ‘ত্যাগী’ নেতা ও তাদের সমর্থক কর্মী-সংগঠকরা তাদের স্ট্যাটাসে প্রকাশ করছেন ক্ষোভ আর হতাশা। পদ না পাওয়া নেতাদের কাউকে কাউকে সমর্থক-কর্মীদের নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান ও বিক্ষোভ করতেও দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ছয় সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। গত ৪ জুন বৃহস্পতিবার সেই কমিটির ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকে পদ না পাওয়া নেতারা ক্ষোভ জানিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বঞ্চিত করা হয়েছে। ঘোষিত কমিটি তাদের মতে, ‘পকেট কমিটি ও হাইব্রিড পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ফসল।’
তবে কেন্দ্রীয় কমিটি বলছে, যোগ্যতা ও ত্যাগের ভিত্তিতেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে পদ পাননি এমন একজন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাভেদ হাসান স্বাধীন। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর দাবি, বিগত দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি রাজপথে সক্রিয় ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছেন। যদিও নতুন কমিটিতে তিনি ঠাঁই পাননি। বিষয়টি সংগঠনের মাঠ পর্যায়ে বিস্ময় ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। কমিটিতে স্থান পাননি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আযম সৈকত। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, একাধিক আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাদের অভিযোগ, ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুগত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।
যুবদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘গত ১৫-১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে ছিলেন না মামলা-হামলার মুখোমুখি হননি, তারাই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। কিন্তু যারা পুলিশের কাছে নির্যাতিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন, তেমন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অনেকেই কমিটিতে স্থান পাননি।’ এক ত্যাগী কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কমিটি গঠনের আগে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অভিমত নেওয়া হয়নি। সভাপতি মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের ঘনিষ্ঠ নেতাদের কমিটিতে নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে কোনো ভূমিকা না রাখলেও মনিরুল ইসলাম সোহাগকে যুগ্ম সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ত্যাগী কর্মীদের হতাশ করেছে। তার মতে, কারও দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রামের মূল্যায়ন করা না হলে সংগঠনে ফাটল ধরবে।’
এদিকে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান না পেয়ে বিক্ষোভ করছেন সংগঠনের পদ না পাওয়া নেতা-সংগঠক ও তাদের সমর্থকরা। গতকাল সোমবার বিএনপি চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ের সামনে এদের একটি অংশ অবস্থান নেন ও বিক্ষোভ করেন। এতে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী অংশ নেন।
প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংগঠনের অনেকেই জেল-জুলুম, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তার পরও যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অথচ তাদের অনেককেই নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়নি। তাদের পরিবর্তে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়ন না করে ‘মাই ম্যান’ জাতীয় ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা সংগঠনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তারা বলেন, দ্রুত পদবঞ্চিতদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে যুবদল সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পদবঞ্চিত নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যুবদলই ভবিষ্যতে বিএনপির মূলধারার নেতৃত্ব দেবে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে বিএনপি আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হবে।’
ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি হুমায়ন কবির বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। অন্যদের তুলনায় আমাদের ত্যাগ কোনো অংশে কম নয়। কমিটিতে আমাদের স্থান না দিয়ে অবিচার করা হয়েছে। আমরা হাইকমান্ডের কাছে সুবিচার চাই।’
ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর ঘোষিত এই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নিবেদিতপ্রাণ ও নির্যাতিত নেতাদের স্থান দেওয়া হয়নি। এটি আসলে শীর্ষ নেতাদের পকেট কমিটি। এত নির্যাতনের পরও যদি সংগঠন আমাদের মূল্যায়ন না করে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।’