× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

নগরকান্দায় চীনা ভাষা শিখছে শিক্ষার্থীরা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে

ফরিদপুরের নগরকান্দার একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে চীনা ভাষা শিখছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ফরিদপুরের নগরকান্দার একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে চীনা ভাষা শিখছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ফরিদপুরের নগরকান্দার এক গ্রামীণ বিদ্যালয়। বিকালের শেষ আলো এসে পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। নিয়মিত ক্লাস শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। তবে বেঞ্চে বসে আছে বেশ কজন শিক্ষার্থী।

দেয়ালে ঝোলানো পুরনো চার্টের পাশেই থাকা বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে চীনের গুয়াংঝু শহর থেকে যুক্ত হওয়া এক তরুণ প্রশিক্ষকের মুখ। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো ‘নি হাও’। সঙ্গে সঙ্গে পুরো শ্রেণিকক্ষ সমস্বরে বলে উঠল ‘নি হাও’। কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো চীনা ভাষা শিক্ষার পাঠ।

গ্রামের একটি সাধারণ স্কুলে বসে বিদেশি ভাষা শেখার এই দৃশ্য কয়েক বছর আগেও কল্পনার মতো ছিল। কিন্তু এখন ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় এটি একটি বাস্তবতা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের নির্দেশনা ও নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে এই দুই উপজেলায় শুরু হয়েছে বিনামূল্যে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম। ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৫ জন শিক্ষার্থী এই কোর্সে যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এটি কেবল একটি ভাষা শেখার প্রকল্প নয়; বরং গ্রামের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষা, বৃত্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার এক বড় উদ্যোগ।

যেভাবে শুরু এই উদ্যোগের

চলতি বছর ৪ এপ্রিল নগরকান্দা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বিদেশগামী বাংলাদেশিদের ভাষা শেখার ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বিশেষ করে চীনা ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের বড় বড় অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পে কাজের সুযোগ বাড়ছে। প্রতিমন্ত্রীর সেই বক্তব্যকে বাস্তবে রূপ দেন ইউএনও সাইফুল ইসলাম।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে সালথার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সাইফুল ইসলাম পরীক্ষামূলকভাবে নবকাম পল্লী কলেজে ২৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ছোট পরিসরে চীনা ভাষা কোর্স চালু করেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর এটি নগরকান্দার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে নগরকান্দার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন এবং সালথায় ২৫ জন শিক্ষার্থী এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা মূলত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, তালমা নাজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, এমএন একাডেমি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আক্রামুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়,  কৃষ্ণারডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় ও নবকাম পল্লী কলেজে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ইউএনও সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে অসংখ্য চীনা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেখানে ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আগামী দিনে শুধু ডিগ্রি নয়, ভাষাগত দক্ষতাও বড় সম্পদ হবে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি।”

চীন থেকে সরাসরি পাঠদান

এই কোর্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রশিক্ষকদের অনেকেই বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন। কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষায় স্নাতক শেষ করে চীনে স্নাতকোত্তর করছেন, কেউবা গবেষণায় যুক্ত। তারা অনলাইনে সরাসরি ক্লাস নিচ্ছেন। পাশাপাশি ঢাকার লিড একাডেমির প্রশিক্ষকেরাও যুক্ত হয়েছেন এতে।

উদ্যোগটির অন্যতম মেন্টর নাজমুন নাহার পলি। দীর্ঘ ১৬ বছর চীনের গুয়াংঝুতে বসবাস করা পলি বর্তমানে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চীনা ভাষা কোর্সের মেন্টর হিসেবে কাজ করছেন।

তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ভাষা শেখানো নয়। শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাক, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করুক এবং দক্ষ দোভাষী হিসেবে গড়ে উঠুকÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

স্বপ্ন দেখছে শিক্ষার্থীরা

লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অলিক সাহা এই প্রতিবেদককে বলে, “আগে ভাবতাম ইংরেজি জানলেই সব হয়। এখন বুঝতে পারছি চীনা ভাষাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে ভয় লাগলেও এখন আমরা নিজেদের পরিচয় চীনা ভাষায় দিতে পারি। নতুন ভাষা শেখা খুব আনন্দের।”

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে। কাজী মোবিন হোসেন নামের এক অভিভাবক বলেন, গ্রামে বসে ছেলে বিদেশি ভাষা শিখছে, এটা আগে কল্পনারও বাইরে ছিল। এখন মনে হচ্ছে ওদের ভবিষ্যৎ বদলে যাচ্ছে। এদিকে এমএন একাডেমির প্রধান শিক্ষক বেলায়েত হোসেন জানান, শিক্ষার্থীরা নতুন ভাষা শিখতে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। 

অর্থায়নে দুই সমাজসেবক

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন দুই সমাজসেবক ও শিল্পপতি। নগরকান্দার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বহন করছেন হানিফ মণ্ডল। অন্যদিকে সালথার নবকাম পল্লী কলেজের কার্যক্রমে ইদ্রিস আলী মোল্লা অর্থায়ন করছেন।

ইদ্রিস আলী মোল্লা বলেন, “গ্রামের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।”

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর চাহিদাও বাড়বে। নগরকান্দা ও সালথার এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার ও স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতা থাকলে গ্রামেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। সরকার চাইলে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এ ধরনের বিদেশি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে।

নগরকান্দার সেই শ্রেণিকক্ষে ক্লাস শেষে এক শিক্ষার্থী যখন হাসিমুখে বলে ওঠে ‘শিয়ে শিয়ে’ (ধন্যবাদ), তখন সেটি কেবল একটি বিদেশি শব্দের উচ্চারণ থাকে না; বরং গ্রামবাংলার নতুন প্রজন্মের বদলে যাওয়া এক বিশাল স্বপ্নের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা