মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১৬:৪২ পিএম
হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া। ছবি : সংগৃহীত
রংপুর সিটি নির্বাচন শেষ হলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভরাডুবির বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্তের ঘটনা টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। নগরীর পদধারী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের ভোটও নৌকা প্রার্থী পাননি এমন কথা মুখে মুখে। তাই ভোটের আলোচনা এখনও পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, চায়ের দোকানে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া কেন হারলেন, চতুর্থ হয়ে কেন জামানত হারালেন এমন বিশ্লেষণ চলছে। নির্বাচন বিশ্লেষক ও সচেতন ভোটারদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নৌকা প্রার্থীর হারের ছয় কারণ।
সিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া ও তাদের অন্তরদহন, প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত, দলীয় কোন্দল ও সমন্বয়হীনতা, দলীয় প্রার্থী দ্বারা প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেওয়া কর্মীদের অবমূল্যায়ন, নতুন প্রার্থী প্রচারণার সময় কম পাওয়া এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর হার হয়েছে।
নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক এমএ মজিদ, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আতাউর জামান বাবু, কোতোয়ালি থানার সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লতিফুর রহমান মিলন নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক, ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। সিটি নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা হলে দলীয় মনোনয়ন পেতে ফরম সংগ্রহ করেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কিন্তু এরই মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বোর্ড জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য সাবেক এমপি হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়াকে মনোনয়ন দেন। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার-প্রচারণায় থাকা সম্ভাব্য প্রার্থীদের অন্তরদহন হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে লতিফুর রহমান মিলন ও আতাউর জামান বাবু মনোনয়ন দাখিল করেন। পরে স্থানীয় নেতারা আতাউর জামান বাবুর মান ভাঙিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করালেও লতিফুর রহমান মিলন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থেকে যান।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, ডালিয়া সিটি নির্বাচনে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ায় ২০৫ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরীতে ১৭ দিনের প্রচারণায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় তিনি পৌঁছাতে পারেননি। এতে করে নৌকা প্রতীক পরিচিত হলেও প্রার্থীকে কাছে না পাওয়ায় ভোটাররা বিমুখ হয়ে পড়েন। দলের পদ বাঁচাতে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সন্তুষ্ট রাখতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্তরদহন নিয়েই জেলা, মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নৌকার প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন। যেসব কর্মী প্রচারণায় কাজ করেছেন তারা দলীয় প্রার্থীর কাছে অবমূল্যায়িত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিকল্পনামাফিক নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়া ও দলীয় সমন্বয়হীনতার কারণে নৌকা প্রতীকের ভোট কমেছে। সেই সাথে বিগত সময়ে লুৎফা ডালিয়া সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য থাকাকালীন নগরীতে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন করেননি এমন ক্ষোভ ছিল নগরবাসীর মনে। নবনির্বাচিত মেয়র মোস্তফা অ্যাডভোকেট ডালিয়ার বিরুদ্ধে এমপি থাকাকালীন সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগও তুলেছেন একাধিকবার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী জানান, ডালিয়া দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর জেলা ও মহানগর এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা করে নৌকাকে বিজয়ী করতে সকলের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কেউ নির্বাচনে অসহযোগিতা করলে তার নামে কেন্দ্রে নালিশ যাবে বলে হুমকিও দিয়েছিলেন। এতে করে নেতারা নিজ খরচে তাদের কর্মীদের নিয়ে ডালিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।
রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডালিয়াকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারা মিলে আমরা প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলাম। যেহেতু তিনি নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণায় ছিলেন না এবং কমিশনের বেঁধে দেওয়া মাত্র ১৭ দিন প্রচারণা চালিয়েছেন, তাই এত বড় সিটি এলাকায় তিনি সকল নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে ভোটাররা নৌকায় ভোট দিতে চাইলেও প্রার্থী তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারায় আমাদের ভোট কমেছে। সেই সাথে দলের আরেকজন প্রার্থী থাকায় নৌকার ভোট বিভক্ত হয়েছে।’
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি বলেন, ‘মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নির্বাচনে এমন ফল এসেছে। আগামীতে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে। আমরা হতাশ নই। অল্প সময়ে জাতীয় নির্বাচনের আগেই রংপুরের আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াবে।’
এ ব্যাপারে মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে সমন্বয়হীনতার কারণে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের প্রার্থীর এমন ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনার অভাব, পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী প্রচারের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। আর এর সুযোগ নিয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। আগামীতে আওয়ামী লীগ তাদের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে ভাল অবস্থানে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।