কুষ্টিয়া
জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৩ এএম
একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ায় এবার ভরাডুবি হয়েছে দলটির। জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই জামায়াতের কব্জায় গেছে। হেরেছে বিএনপি প্রার্থীরা। এর মধ্যে কুষ্টিয়া ২ ও ৩ আসনে হারের পার্থক্যটাও চোখে পড়ার মতো। এখন জেলায় বিএনপির একমাত্র কান্ডারি রেজা আহমেদ। তিনি কুষ্টিয়া-১ আসনে বেশ বড় ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
বিএনপি নেতাদের
কাছে এ ফল অপ্রত্যাশিত হলেও স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি হওয়ার কথা
ছিল। তাদের মতে অন্তত তিনটি কারণে কুষ্টিয়ায় বিএনপির এই শোচনীয় পরাজয়। দুটি
আসনে প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপির হঠকারিতা ছিল। এ ছাড়া দলের মধ্যে মারাত্মক কোন্দল
এই ভরাডুবিতে অনুঘটকের কাজ করেছে। পাশাপাশি জামায়াতের কৌশলের কাছেও বিএনপি অসহায় হয়ে
পড়ে।
নির্বাচনের প্রাপ্ত
ফলাফল অনুযায়ী কুষ্টিয়া-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে
বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আমির হামজা। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮২
হাজার ৪৭৬ ভোট। আর বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ ভোট। কুষ্টিয়া-২
আসনে বিএনপি প্রার্থী ও দলের আইনজীবী নেতা ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরীও বিশাল ব্যবধানে
ধরাশায়ী হয়েছেন জামায়াতের আব্দুল গফুরের কাছে। জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ
৯২ হাজার ৮৩ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন এক লাখ ৪৩ হাজার ৮২১ ভোট।
তবে কুষ্টিয়া-৪
আসনে বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি জামায়াতের আফজাল হোসেনের কাছে পরাজিত
হলেও ভোটের ব্যবধানটা অপেক্ষাকৃত কম। ওই আসনে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন এক লাখ ৪৮
হাজার ২০১ ভোট। আর বিএনপি প্রার্থীর ঝোলায় ঢুকেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬০৩ ভোট। জেলার ভারত
সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-১ আসনে বিএনপির রেজা আহমেদ
দলের সম্মান রক্ষা করেছেন। তিনি বড় ব্যবধানে জামায়াতের বেলাল উদ্দিনকে হারিয়েছেন। এ
আসনে বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৯ ভোট। আর জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন
৮৬ হাজার ৬৮২ ভোট। এবারের নির্বাচনে ভোটের এমন ফলাফল বিএনপি নেতাদের কাছে বেশ অপ্রত্যাশিত।
জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে একমাত্র কুষ্টিয়া-২ আসনে
হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা বলছেন এই পরাজয়ের
জন্য অনেকাংশে বিএনপিই দায়ী। তাদের মতে কুষ্টিয়া-২ ও ৩ আসনে দলের পরীক্ষিত দুই
নেতাকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় অপেক্ষাকৃত কমজোর প্রার্থীদের। কুষ্টিয়া-৩
আসনে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের। তিনি এ আসনে দুইবারের এমপি ছিলেন
এবং জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়াও তিনি মুক্তিযোদ্ধা দলের সাবেক কেন্দ্রীয়
সভাপতি।
তবে নির্বাচনে তাকে
বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে। তার আগে জেলা বিএনপির
কমিটি ভেঙে দিয়ে (যে কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন) প্রকৌশলী
জাকির হোসেন সরকারকে সদস্য সচিব এবং কুতুব উদ্দিনকে আহ্বায়ক করা হয়। জেলার মিরপুর
ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-২ আসনে। ওই আসনে জেলা বিএনপির সাবেক
সভাপতি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম পরপর দুইবার দলীয়
মনোনয়নে এমপি হন। তবে এবারের নির্বাচনে তাকে টপকে টিকিট বাগিয়ে নেন বিএনপির আইনজীবী
নেতা ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী। ভেড়ামারা-মিরপুরের রাজনীতিতে তার অবস্থান খুবই
দুর্বল। তিনি পেশাগত কারণে বেশিরভাগ সময় ঢাকাতে অবস্থান করেন। কুষ্টিয়া-১ ও ৩ আসনে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে মনোনীত প্রার্থীরা
পক্ষে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সমর্থকদের ওপরে কাজ করতে দেখা গেলেও তাদের আন্তরিকতার
যথেষ্ট ঘাটতি ছিল।
এ ছাড়া জেলার কুমারখালী
ও খোকসা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী এবং ওই আসনের দুই
বারের সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি অপেক্ষাকৃত কম ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।
কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম আনসারের অসহযোগিতায় তার এই পরাজয় বলে
মনে করছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। কুষ্টিয়া-১ আসনে দলীয় কোন্দলের মাত্রা কম
থাকায় দলের প্রার্থী আশানুরূপ জয় পেয়েছে বলে মনে করছেন নেতারা।