ঢাকা-১৩ আসন
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩২ এএম
রাজধানী ঢাকার মোহাম্মপুরের বাসস্যান্ড সংলগ্ন ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি সাত মসজিদের (সাত গম্বুজ মসজিদ) সামনের সাতমসজিদ মার্কেটের পশ্চিমপার্শ্বের একটি চায়ের দোকানে বেশ ভিড়। প্রায় সবারই আলোচনার বিষয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে কে কেমন ভোট পাবেন। নানা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে তা তুলে ধরছেন। ব্যক্তি প্রার্থী কেমন ভোট পাবেন, দলীয় ভোট কীভাবে এগিয়ে রাখবেসহ বিভিন্ন সমীকরণ মিলিয়ে নিচ্ছেন।
এমনই আলোচনার
মধ্যে পূর্বপরিচিত কয়েকজনের কাছেÑ ভোটের কী অবস্থা, কে জিতবে মনে হচ্ছে?Ñ জানতে
চাইলে তারা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমার এখানে প্রতিদিন শত শত লোক চা খেতে
আসে। প্রায় সবাই ভোটের আলোচনা করে। তাদের কাছে থেকে শুনি এবং আমি নিজেও প্রতিদিন
দেখছিÑ এ এলাকায় ভোট প্রচার-প্রচারণা, আলাপ-আলোচনা থাকলেও উৎসবের আমেজ কম। শুধু
মানুষের মধ্যে অল্পবিস্তর আলোচনা আর মাইকে নির্বাচনী প্রচারণা ছাড়া মানুষের মাঝে
ভোটের সময় যে একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকে তা নেই।
রাজধানীর অন্যতম
অপরাধপ্রবণ এবং ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এ
আসনটিতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রকাশ্য মিছিল-মিটিংয়ের চেয়ে এই আসনে চলছে নীরব
হিসাবনিকাশ। সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক সমস্যাসহ নানা সমস্যায়
জর্জরিত এ আসনের অধিকাংশ মানুষজনও নীরবে রয়েছে; তারা কী করবেন তা বুঝতে দিচ্ছেন না।
আবার অনেকের কণ্ঠে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মাদক, ছিনতাই এবং
গ্যাস-পানির সংকটের সমাধান না হওয়ার বিষয়ে ঝরছে ক্ষোভ। এ ছাড়া দখল ও ফুটপাতে দোকান
নিয়েও তাদের অভিযোগ আছে। এর সঙ্গে আছে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও জেনেভা ক্যাম্পের প্রায়
৩০ হাজার ভোটারের ভোট টানার প্রসঙ্গও। যে কারণে এ আসনের প্রার্থীরা যেমন ভিন্ন
ভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করছেন, তেমনই তারা এসব নাগরিক সমস্যা সমাধানের দিকে জোর
দিচ্ছেন।
গত কয়েক দিন
মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর এলাকার কিছু অংশ নিয়ে (ঢাকা উত্তর সিটি
করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে) গঠিত ঢাকা-১৩ আসনের
বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। এ আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করলেও এসব আলোচনায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং জামায়াতে ইসলামী
নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির
মামুনুল হকের কথা ঘুরেফিরে উঠে আসছে।
এর মধ্যে
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নিতে গত ডিসেম্বরে
নিজ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন ববি হাজ্জাজ। তার প্রতীক ‘ধানের শীষ’। অন্যদিকে ১১
দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল
হকের তার দলের প্রতীক ‘রিকশা’। আসনের ভোটার ও সাধারণ মানুষের ভাষ্যÑ সারা দেশে
বিশেষভাবে পরিচিত এই দুজন প্রার্থীর মধ্যেই অর্থাৎ ‘ধানের শীষ’ ও ‘রিকশা’ প্রতীকের
মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে
চাইলে সাতমসজিদ মার্কেটের পশ্চিমপাশের একটি চায়ের দোকানের কর্ণধার মোহাম্মদ
ইব্রাহিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ এলাকা (সাত মসজিদ বা বাঁশবাড়ি) মামুনুল
হকের এলাকা, এখানে যারা চা খেতে আসেন- ভোট নিয়ে আলোচনা করেন তাদের কাছে থেকে শুনি
এ এলাকায় ‘রিকশা’ বেশি ভোট পাবেন। কেউ কেউ আবার বলেনÑ না, ববি হাজ্জাজও ভালো ভোট
পাবেন। ববি হাজ্জাজ উচ্চশিক্ষিত; মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। আমার মনে হয়,
তাদের দুজনের মধ্যে সমানে সমানে লড়াই হবে।
জাতীয় সংসদের
৩০০টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে ১৮৬ নম্বরের এ আসনটির বাকি ৬ জন সংসদ সদস্য
পদপ্রার্থীরাও থেমে নেই। এ আসনের ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন ভোটারের নিজের দিকে টানতে প্রচারণায়
মহাব্যস্ততার সময় পার করছেন। এর মধ্যে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ‘আপেল’
মার্কার ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ‘ট্রাক’ মার্কার মিজানুর
রহমান, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে ‘মই’ মার্কার মো. খালেকুজ্জামান,
বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে ‘রকেট’ মার্কার মো. শাহাবুদ্দিন,
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শেখ মো. রবিউল ইসলাম ‘ঘুড়ি’ এবং সোহেল রানা ‘কলস’
মার্কায় নির্বাচন করছেন। তারা নানাভাবে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। একজন
আরেকজনের বিরুদ্ধে ছুড়ছেন কথার তীরও। তবে অপরাধপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এ
আসনটিতে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ভোট নিয়ে
স্থানীয়রা বলছেনÑ আমাদের এই এলাকা কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে
পরিচিত। রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের জন্য আমরা
নিরাপদে চলাচল করতে পারি না। আমরা ভয়ে থাকি কখন; কোন সময় কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী
চক্রের সদস্যরা এসে আকস্মিক হামলা করে সব কেড়ে নেয়। এই এলাকায় কেউ জায়গা কিনলে
সন্ত্রাসীদের জন্য টাকার ভাগ রাখতে হয়। এ ছাড়াও কেউ নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা
বাড়ি করতে গেলেই মোটা অঙ্কের চাঁদা রাখতে হয় সন্ত্রাসীদের জন্য।
তারা আরও বলেন, আমরা
বছরের পর বছর বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে শুধু প্রতিশ্রুতি পাই। কখনও
কিশোর গ্যাং নির্মূল করতে দেখা যায়নি। আশা করছি, আগামীতে সংসদ সদস্য হয়ে যিনি
আসবেন, তিনি সর্বপ্রথম এসব অপরাধ দমনে কাজ করে এলাকায় শান্তি ফেরাবেন।