আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৪ এএম
জামায়াত-বিএনপি লোগো। ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের যে দুই প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তারা দুজনই নির্বাচনি এলাকার বাইরের বাসিন্দা। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তিনি ঢাকায় বড় হয়েছেন শাহীনবাগ এলাকায়। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানের গ্রামের মানিকগঞ্জে হলেও তার বেড়ে ওঠা মিরপুরের মনিপুর এলাকায়, যা ঢাকা-১৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত। এলাকার বাইরের এই দুই প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সাবেক সংসদ সদস্য এসএ খালেকের পুত্র ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন। বহিরাগত দুই বড় দলের প্রার্থীর যেকোনো একজনের জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাজু।
ঢাকা-১৪ আসনটি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন, বনগাঁও ইউনিয়ন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ০৭, ০৮, ০৯, ১০, ১১ ও ১২ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। মিরপুর রোড়ের টেকনিক্যাল থেকে শুরু করে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত সড়কের পশ্চিমাংশ থেকে সাভারের দুটি ইউনিয়ন নিয়েই এই নির্বাচনি এলাকা। এই এলাকায় ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, দারুস সালাম থানা, মাজার রোড়, শাহ আলীসহ গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার মাত্র ৪ জন। এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির হেলাল উদ্দিন (লাঙ্গল), এলডিপির সোহেল রানা (ছাতা), এবি পার্টির মনিরুজ্জামান (ঈগল), জেএসডির নুরুল আমিন (তারা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন (কাস্তে), গণফোরামের জসিম উদ্দিন (উদীয়মান সূর্য), ইসলামী আন্দোলনের আবু ইউসুফ (হাতপাখা), রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন (হাতি) ও সুপ্রিম পার্টির ওসমান আলী (একতারা)। তবে তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট নেই।
বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিলেন শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম হওয়া পরিবারদের নিয়ে গড়া সংগঠন ‘মায়ের ডাকে’র মাধ্যমে। তার ভাই বিএনপির তরুণ নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন গুম হওয়ার পর থেকেই সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের ডাক’ সংগঠন। এই সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলে। ভাই হারানোর সহমর্মিতা থেকে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী করা হলেও দলের অধিকাংশ তৃণমূল নেতাকর্মীরা তা মেনে নিতে পারেনি।
সাবেক সংসদ সদস্য এসএ খালেকের সন্তান এসএ সিদ্দিক সাজু এই আসনে বিএনপির মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার ছিলেন। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় তার শক্ত অবস্থান গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের মত, তাকে বাদ দিয়ে এলাকার বাইরে থেকে প্রার্থী দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে এসএ সিদ্দিক সাজুকে সপরিবারে দাওয়াত দেন। একই টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করাসহ বিভিন্নভাবে আশ্বাস দেওয়া হলেও তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এলাকার সন্তান হওয়ায় নির্বাচনি প্রচারে বাড়তি সুবিধাও পাচ্ছেন তিনি।
উত্তর সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু জাফর জানান, এলাকায় প্রচারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজু এগিয়ে রয়েছেন। এখানে বিএনপি প্রার্থীর যেমন পরিচিতি নেই। তেমনি কর্মী-সমর্থকও নেই। দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপির ভোট পেলেও তার জন্য কেউ আন্তরিকভাবে কাজ করছেন না। অন্যদিকে সাজু ভাইয়ের জন্য অনেকেই নেমে পড়েছে। বাবার পরিচিতি তাকে বাড়তি সুবিধা জোগাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থী আরমান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার হন। দীর্ঘ আট বছর নিখোঁজ থাকার পর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তি পান। জামায়াতের চেইন অব কমান্ডের কারণে প্রার্থিতা নিয়ে ক্ষোভ না থাকলেও এলাকায় তাকে পরিচিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এতদিন সবার ধারণা ছিল বাবার এলাকা ঢাকা-১৫ আসন থেকে লড়বেন তিনি। কিন্তু সে আসনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রার্থী হওয়ায় বাধ্য হয়েই ব্যারিস্টার আরমান এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনে তার দীর্ঘ অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেটা ভোটে জেতার জন্য কতটা কার্যকর হবে সেটা বলা কঠিন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আশাবাদী হচ্ছেন তার কর্মী-সমর্থকরা।