বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:০০ এএম
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:১৯ এএম
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার ঘিরে আলোচনা চলছে জনপ্রশাসনেও। কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যালোচনা করে দেখছেন কোন দল জনপ্রশাসন সংস্কার ও আমলাতন্ত্রে পেশাদারত্ব নিয়ে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন আগ্রহ ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
এ ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দলের নির্বাচনি ইশতেহারের মতো এটিও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দলিল। তবে আমলাদের কাছে ইশতেহারের গুরুত্ব অন্য রকম। গত দেড় দশকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় বিবেচনা, অনুগত-অননুগত বিভাজন, কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না পাওয়া কিংবা হঠাৎ পদায়ন বাতিলের মতো অভিযোগ বারবার উঠেছে। এই বাস্তবতায় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমন রাজনৈতিক অঙ্গীকার খুঁজছেন, যেখানে ‘যোগ্যতা’ ও ‘পেশাদারত্ব’ শব্দগুলো কেবল স্লোগান নয়, বরং নীতিগত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখছেন অনেক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রশাসনের মধ্যে যে আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে প্রশাসনে সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়। এটি জনপ্রশাসনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে। প্রশাসনের ভেতরে জন্ম নেওয়া এই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।’
বিএনপির ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এতে বলা হয়েছেÑ প্রশাসনে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বিএনপির ইশতেহারে মেরিটোক্রেসির বিষয়টি শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়; বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার, সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তা কাঠামোগতভাবে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের মাধ্যমে একটি ‘দলদাস আমলাতন্ত্র’ গড়ে উঠেছিল। বিএনপির ইশতেহারে মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না করার প্রতিশ্রুতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এ ইশতেহারে প্রশাসনে কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সে অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারে প্রশাসন-সংক্রান্ত অধ্যায়ে জবাবদিহিতামূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনের কথা বলা হয়েছে। দক্ষ, মেধাবী ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার, ই-গভর্ন্যান্স চালু এবং দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার রয়েছে।
এ বিষয়ে নবম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. শামসুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ইশতেহার আর কোনো রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেনি। দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারাবদ্ধ দলগুলোর সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করবে এই প্রতিশ্রুতি প্রশাসনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।’
শূন্যপদ পূরণ, নতুন পে-স্কেল দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা ইশতেহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়ে আসছেন সরকারি কর্মচারীরা।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম জানান, বিএনপির নির্বাচনি ইস্তেহারে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকায় তারা খুশি। কারণ পে-স্কেল কেবল আর্থিক বিষয় নয়; এটি প্রশাসনের মনোবল, পেশাগত মর্যাদা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের সঙ্গেও যুক্ত।
ইশতেহারে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে-এ কথা স্বীকার করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। তবে এ নিয়ে যেমন আশাবাদ আছে, তেমনি আছে সতর্কতাও।
প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন ও শক্তিশালী পিএসসি
বিএনপির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। তাই যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের অঙ্গীকার রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাধারণ প্রশাসনসহ সব খাতে নিয়োগে পিএসসির ভূমিকা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারে প্রশাসনের বাইরেও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ কমিশন, স্বতন্ত্র তদন্ত সার্ভিস, সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আঞ্চলিক উন্নয়নসহ বিস্তৃত রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটলে জনপ্রশাসনের কাজের পরিবেশ ও কার্যকারিতাও সরাসরি প্রভাবিত হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।