আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০৪ পিএম
ফেনীর তিনটি আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার ও নানা কর্মকাণ্ড ভোটে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ফেনীর তিনটি আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা হলেও এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণাসহ নানা কর্মকাণ্ড ভোটে লড়াই হবে জানান দিচ্ছে। জেলার তিনটি আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৩০৫ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৯২৪ জন, পুরুষ ভোটার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৪ জন। তিনটি আসনে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ৩০ হাজার ১৫১ জন প্রবাসী। তিনটি আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২৮টি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ১১ দলীয় জোটে থাকলেও শেষ পর্যন্ত আলাদা নির্বাচন করায় কিছুটা চাপে পড়েছে জামায়াত ও এবি পার্টির প্রার্থীরা। তিনটি আসনেই হাতপাখা ও বটগাছের নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট আছে। জেএসডির তেমন ভোটব্যাংক না থাকলেও অভিমানি সমর্থকরা এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তারপরও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মতে জেলার তিনটি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের প্রার্থীদের সঙ্গে। এর মধ্যে ফেনী-১ ও ৩ আসনে দাড়িপাল্লা আর ফেনী-২ আসনে জোটের প্রার্থী ঈগল। আর নির্বাচনে ছোট-বড় মাঝারি দল বিবেচনার না করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সব প্রার্থী।
ফেনী-১ আসন (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা)
ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলা ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। দেশের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নানা কারণে ফেনীর সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটি জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এরই মধ্যে তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও দুবার বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
এরমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে জয়ের পাল্লা অনেকটা ভারী ফেনী-১ আসনে। গত তিন প্রহসনের নির্বাচন ব্যাতীত দল প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেগম জিয়াই এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ২০০১ সালে উপনির্বাচনে ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দরকে আসনটি ছেড়ে দেন। এরপর ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে খায়রুল বশর মজুমদার তপন মনোনয়ন পেলেও জোটের কারণে জাসদ (ইনু) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতারকে আসনটি ছেড়ে দেয়। এর ফলে টানা দুবার বিনাভোটে এমপি হন শিরিন। ২০২৪-এর নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনার সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিনাভোটে এমপি হন।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এ আসনে কপাল খুলে দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক মুন্সি রফিকুল আলমের। যদিও তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষের কান্ডারি হয়েছিলেন। বেগম জিয়া মনোনয়ন দাখিল করার পর মৃত্যুবরণ করলে বিকল্প হিসেবে আগে থেকেই রফিকুল আলমের নামে দলীয় মনোনয়ন থাকায় তাকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের পৈতৃক বাড়ি হওয়ায় আসনটিকে ধানের শীষের বলেই ধরা হয়। তবে অতীতের মতো এত সহজে তরি পার হতে পারছেন না বিএনপি প্রার্থীÑ এমনটি বলছেন ভোটাররা। কারণ হিসেবে অনেকের মতো ধানের শীষের প্রার্থী এ আসনের বাসিন্দা নই। তার বাড়ি সদর উপজেলায় আর রাজনীতি করেন ঢাকায়। বিপরীতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী স্থানীয়।
ফেনী-২ আসন (ফেনী সদর উপজেলা ও পৌরসভা)
জেলার তিনটি আসনের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফেনী-২ আসন। কারণ এ আসনের এমপিই হয়ে উঠেন জেলার নিয়ন্ত্রক। সদর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১২ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত আসনটি। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি দুবারই মাত্র এ আসনে জয়ী হতে পেরেছে। তার বিপরীতে আওয়ামী লীগ জিতেছে সব নির্বাচনে। জাসদ একবার জিতলেও জয়নাল আবদিন (ভিপি জয়নাল) বিএনপিতে যোগদান করার পর দলটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পড়ে। আর বিএনপি ভিপি জয়নালের হাত ধরেই আসনটিতে ভাগ বসায়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিনাভোটে এমপি হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী। এর আগে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন আলোচিত জয়নাল আবেদিন হাজারী। ২০০১ সালে সেনা অভিযানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর তার জায়গা দখলে নেন নিজাম হাজারী।
ভোটের হিসেবে অন্য দলের তুলনায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এবার সমীকরণ ভিন্ন। জোটের কারণে হেভিওয়েট প্রার্থী অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞাকে বলি দিয়েছে জামায়াত। ১০ দলীয় জোটের হয়ে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঞা (মঞ্জু)। এক সময়ের ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন তিনি। এবি পার্টির তেমন ভীত না থাকলেও জামায়াত কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন ঈগল মার্কার পক্ষে। সে ক্ষেত্রে ধানের শীষের প্রার্থীর ঘাম ঝরাতে হচ্ছে মাঠে। প্রার্থীর শারীরিক অবস্থাসহ নানা কারণে আসনটি নিজেদের ঘরে রাখাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বিএনপির জন্যÑ এমন মন্তব্য ভোটারদের।
ফেনী-৩ আসন (দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলা)
আসনটি দাগনভূঞা উপজেলার একটি পৌরসভা, ৮ ইউনিয়ন ও সোনাগাজী উপজেলার এক পৌরসভা ৯ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। জেলার তিনটি আসনের মধ্যে জটিল সমীকরণের আভাস দিলেও বিএনপি থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থী হওয়ায় সমীকরণ বদলে গেছে। জেএসডির (রব) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বিএনপি জোট থেকে মনোনয়ন পাবেনÑ এমনটি গুঞ্জন উঠলেও শেষ পর্যন্ত তার আর হয়নি। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলায় মিন্টুর আগে যেকোন দল থেকেই কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী নির্বাচনে লড়াই করেননি। এতে বাড়তি সুবিধা বিএনপির। তবে দীর্ঘদিন আগে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করায় জামায়াত প্রার্থী মাঠ ঘুচিয়ে রাখেন। প্রতিটি বাড়ি ঘরে পৌঁছানোর পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদানের মধ্য দিয়ে মানুষের খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন জামায়াতের প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক। এ ছাড়া দলের মধ্যে ঐক্য থাকায় বাড়তি সুবিধায় রয়েছে জামায়াত।
সব শঙ্কার মধ্যেও মিন্টু ও ফখরুদ্দিন একই উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় প্রথমবারের মতো এমপি পেতে যাচ্ছে দাগনভূঞা। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে ফেনী সদর, সোনাগাজী, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে আসনে যুক্ত থাকলেও একবারও দাগনভূঞা থেকে এমপি নির্বাচিত হয়নি।