প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৫ পিএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:০২ পিএম
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত নারীদের নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছে। পোস্টটির দায় ‘হ্যাকারদের’ ওপর চাপালেও তা নিয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ জানিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সাইবার হামলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে জামায়াত।
শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল থেকে শনিবার বিকালে নারীদের নেতৃত্ব ও কর্মজীবন নিয়ে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
এ ঘটনার পর রাতেই হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। অভিযোগ করা হয়, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে পোস্টটি দেওয়া হয়েছে।
রাত ১২টা ৪০ মিনিটে ফেসবুকে দেওয়া জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়, সমন্বিত পদ্ধতিতে হামলাকারীরা সাময়িকভাবে জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে দ্রুত পদক্ষেপে দলের সাইবার টিম অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পোস্টে আমিরের নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।
সন্তুষ্ট নয় বিএনপি
জামায়াতের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় বিএনপি। গুলশানে দলের নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে রবিবার সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক—সেটাই প্রশ্ন।
তার ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তাৎক্ষণিকভাবে জনগণকে জানানো দায়িত্ব। কিন্তু ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হ্যাকিংয়ের কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ওই সময়ের মধ্যে আমিরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাধিক পোস্ট এলেও এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের কোনো সতর্কবার্তা দেখা যায়নি।”
মাহদী আমিন আরও বলেন, জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে হ্যাকের বিষয়টি জানা যায়, কিন্তু জিডি করা হয়েছে গভীর রাতে। “প্রায় ১২ ঘণ্টা বিলম্ব কেন—তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি আছে?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হ্যাকের ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের দাবিও সন্দেহজনক বলে মন্তব্য করেন মাহদী আমিন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, পোস্টে ব্যবহৃত ভাষা সত্য হলে তা নারীদের প্রতি চরম অবমাননাকর এবং এটি মধ্যযুগীয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে বলেও জানান তিনি।
ঢাবি ছাত্রদলের মানববন্ধন
এদিকে জামায়াত আমিরের ‘নারীবিদ্বেষী’ মন্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
মধুর ক্যান্টিন থেকে রবিবার দুপুরে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মিছিলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘নিপীড়কের বিরুদ্ধে—ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘রাজাকারের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’-সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
‘গভীর ষড়’যন্ত্র’ দেখছে জামায়াত
অন্যদিকে, জামায়াত এ ঘটনাকে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রবিবার দুপুরে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে খারাপ ও আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চলছে।”
তিনি জানান, তথ্যপ্রযুক্তি দল বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার কথাও বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম সময়ক্রম তুলে ধরে বলেন, বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে আপত্তিকর পোস্টটি দেওয়া হয়। বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে বিষয়টি জানা যায় এবং ৫টা ৯ মিনিটে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করা হয়। পরে জানানো হয় অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল।
প্রযুক্তিগত উপস্থাপনায় প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান দাবি করেন, সরকারি মেইল ব্যবহার করে ফিশিংয়ের মাধ্যমে হামলার চেষ্টা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য আছে এমন একটি ফাইল পাঠানো হয়েছিল, যা সন্দেহজনক। এ বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থায় অভিযোগ জানানো হবে।
জামায়াতের দাবি, শুধু আমিরের অ্যাকাউন্ট নয়, দলের আরও কয়েকটি পেজে সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার হামলার চেষ্টা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, হ্যাকের দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং ঘটনাটি নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কে বা কারা এর পেছনে—তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।