নারায়ণগঞ্জ
এম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২৫ পিএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪ পিএম
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে পুরনো হিসাব-নিকাশ। যে পাঁচটি সংসদীয় আসন একসময় বিএনপির অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে টানা ষোল বছর ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ভোটারদের মধ্যে তৈরি করেছে দীর্ঘ ক্ষোভ ও নীরব অসন্তোষ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই নীরবতা ভাঙতে শুরু করেছে। সরেজমিন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, হারানো ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা এবং পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ নতুনভাবে ফিরে আসার ইঙ্গিত। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই চলছে বিএনপির পুনরুদ্ধার যুদ্ধ যেখানে প্রতিটি আসনেই দলীয় প্রার্থী, বিদ্রোহী ও ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জমে উঠেছে ত্রিমুখী লড়াই। প্রার্থী ঘোষণা, গণসংযোগ ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় জেলার প্রতিটি আসনেই এখন নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে।
নারায়ণগঞ্জ-১
নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-১
আসন। ব্রিটিশ আমল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য ও মসলিন, জামদানির মতো শিল্পের জন্য রূপগঞ্জ
ছিল বিখ্যাত। মোট সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলা। ঢাকার উপকণ্ঠে এবং
একই সঙ্গে বাংলাদেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা
রূপগঞ্জের অবস্থান। ফলে রাজনৈতিকভাবেও এ আসনটির গুরুত্ব অনেক বেশি।
ঢাকার অদূরেই রূপগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। ফলে রাজনৈতিক
বিভিন্ন কর্মসূচিতে ও ঢাকাকেন্দ্রীক আন্দোলনে এই এলাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি। এ ছাড়া
এলাকাটির জনঘনত্ব
ও শিল্পাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক জামদানি শাড়ি তৈরির জন্য
সুপরিচিত জামদানি পল্লী রূপগঞ্জেই অবস্থিত। দেশের বৃহৎ কাপড়ের বাজার হিসেবে পরিচিত
গাউছিয়া মার্কেটও এই উপজেলায়। পাশাপাশি পল্টন সিটি, বড় বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও
গার্মেন্টস হাব রয়েছে। এর ফলে এলাকার ভোটারদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণ ও শ্রমিক শ্রেণির
প্রাধান্য তৈরি করেছে।
এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪ হাজার ৪১৫। এদের মধ্যে পুরুষ
ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার ১০১ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩১২ জন। এ ছাড়া
হিজড়া ভোটার আছেন
২ জন। এ আসনে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৯টি এবং ভোটকক্ষ ৭৬৩টি। এখানে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
নেই।
আসনটিতে একসময় শক্তিশালী অবস্থানে ছিল বিএনপি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরী এই আসন থেকেই নির্বাচন করতেন। তার মৃত্যুর পর আসনটি আর উদ্ধার করতে পারেনি বিএনপি। পরপর তিনটি নির্বাচনে আসনটি কব্জায় রেখেছিল আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ নির্বাচিত হয়েছিলেন সুলতান উদ্দিন ভূঁইয়া। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হন আব্দুল মতিন চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ বিজয়ী হন। ২০০১ সালে পুনরায় আসনটি উদ্ধার করেন মতিন চৌধুরী। ২০০৮ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দুলাল হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর মো. আনোয়ার হোসেন মোল্লা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. রেহান আফজাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইমদাদুল্লাহ।
বিএনপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন,
নির্বাচিত হলে পরিবারভিত্তিক ফ্যামিলি কার্ড চালু করব, যাতে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের
জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান
সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে এক নতুন আশা ও সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে দিতে চাই। ৩১ দফা পরিকল্পনার
আওতায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমাদের দল কাজ করবে।
জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসাইন মোল্লা বলেন,
আমাদের উদ্দেশ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। আমরা চাঁদাবাজি,
দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেব। নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করব,
যাতে জনগণকে সঠিক সুবিধা ও সেবা দেওয়া যায়।
নারায়ণগঞ্জ-২
ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই আড়াইহাজার
উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আড়াইহাজার নারায়ণগঞ্জ
জেলার একটি অংশ এবং ঢাকা জেলার কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে রাজনৈতিক বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে
এই অঞ্চলের গুরুত্ব যথেষ্ট রয়েছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের
কাছেই এই উপজেলার অবস্থান। পাশাপাশি এই এলাকাটি মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত, যা এই অঞ্চলের
অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আড়াইহাজার উপজেলার বড় অংশই গ্রাম ও মফস্বল
এলাকা। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষই এই এলাকার প্রধান
ভোটব্যাংক। পাশাপাশি তরুণ শিক্ষার্থী ও মহিলা ভোটারও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে
পরিচিত থাকলেও আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে এই আসনে। ১৯৮৬ সালে আসনটি থেকে আওয়ামী
লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন এমএ আউয়াল। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে
যোগ দিয়ে লাঙ্গল মার্কা নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন এমএ আউয়াল। ১৯৯১
সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি নেতা আতাউর রহমান খান আঙ্গুর এমপি নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এমদাদুল হক ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১
সালে পুনরায় বিজয়ী হন আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এমপি নির্বাচিত
হন নজরুল ইসলাম বাবু।
এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী
নজরুল ইসলাম আজাদ, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র হিসেবে সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর, জামায়াতে
ইসলামীর মো. ইলিয়াস মোল্লা, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মো. হাবিবুল্লাহ এবং কমিউনিস্ট
পার্টির সাবেক সভাপতি হাফিজুল ইসলাম মাঠে আছেন।
তবে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ ও জামায়াতে ইসলামী
প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লার মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী
বিএনপি সাবেক এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৯ জন। এদের মধ্যে
পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৮৩ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৬১ জন। এ ছাড়া হিজড়া
ভোটার ৫ জন। এ আসনে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৮টি এবং মোট ভোটকক্ষ ৭০৭টি। ঝুঁকিপূর্ণ
কেন্দ্র নেই।
বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা। আমি নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জের সব যুবক-যুবতীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। পাশাপাশি, আমরা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেব, যাতে জনগণকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, আমরা নারায়ণগঞ্জে নতুন বন্দোবস্ত কায়েম করব, যেখানে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মুক্ত একটি পরিবেশ থাকবে। আমি আপনাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, নির্বাচিত হলে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনই নয়, বরং একটি সুষ্ঠু, সুশাসিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
নারায়ণগঞ্জ-৩
সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩
আসনটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক উভয় দৃষ্টিকোণেই গুরুত্বপূর্ণ। সোনারগাঁ বাংলাদেশের প্রাচীন
জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শিল্পকলার তীর্থভূমি খ্যাত। মধ্যযুগে
সোনারগাঁ মুসলিম সুলতানদের রাজধানী ছিল এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ছিল। সোনারগাঁয়ের
ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর এখনও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান।
গোয়ালদী মসজিদ, পানাম নগর এবং শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর সব যেন ইতিহাসের
একেকটি পৃষ্ঠা। ভৌগোলিকভাবে, সোনারগাঁ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কাছে এবং বঙ্গোপসাগরের
কাছাকাছি অবস্থিত, যা এটিকে একটি কৌশলগত অবস্থানে এনে দিয়েছে। দেশের লাইফলাইন খ্যাত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও এই সোনারগাঁয়ের ওপর দিয়ে ঢাকাকে দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে
সংযুক্ত করেছে।
পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় এই এলাকা ঘিরে অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে।
ফলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন ঐতিহাসিকভাবেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে
পরিচিত। পাশাপাশি জাতীয় পার্টিরও রয়েছে শক্ত অবস্থান। ১৯৮৬ সালে আসনটিতে জাতীয় পার্টির
মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন মোবারক হোসেন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আবু নূর মোহাম্মদ
বাহাউল হক এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারবার আসনটিতে
এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম। ২০০৮ সালে আসনটিতে প্রথমবারের মতো
জয় পান আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আসনটি
ছেড়ে দিলে জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা আসনটি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালেও
লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় এমপি হন আওয়ামী লীগের আব্দুল্লাহ
আল কায়সার হাসনাত।
এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী
আজহারুল ইসলাম মান্নান, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল
করিম (বহিষ্কৃত) বিদ্রোহী আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন
(বহিষ্কৃত), জামায়াতে ইসলামীর ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ, খেলাফত
মজলিসের মুহা. শাহজাহান, গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর
রহমান নান্নু মুন্সী মাঠে আছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৩
জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯৮ হাজার ৩০৮ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫১ জন। এ ছাড়া
হিজড়া ভোটার ৪ জন। এ আসনে ভোটকেন্দ্র ২১০টি এবং ভোটকক্ষ ১ হাজার ১২৮টি। ঝুঁকিপূর্ণ
কেন্দ্র নেই।
বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, নির্বাচিত
হলে, যুবকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও চাকরি প্রদান করব। প্রতিটি পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য
কার্ড প্রদান করে জনগণের জন্য সুলভ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন
করে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করব।
জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করব। নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করে এখানে সুষ্ঠু শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে জনগণ তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতভাবে পায়।
নারায়ণগঞ্জ-৪
ফতুল্লা-সদর আংশিক নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি গঠিত। জেলার
অন্যতম জনবহুল ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা ফতুল্লা। এটি শুধু একটি ইউনিয়ন বা শিল্পাঞ্চল নয়
ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে ফতুল্লা এখন জাতীয়
পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। ফতুল্লা ঢাকার লাগোয়া হওয়ায় রাজধানীর শিল্প ও বাণিজ্য
সম্প্রসারণে অন্যতম প্রধান সাপোর্টিং জোন হিসেবে বিবেচিত। সড়ক ও নদীপথ উভয় যোগাযোগ
ব্যবস্থা থাকায় ফতুল্লা সহজেই নারায়ণগঞ্জ শহর, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে
যুক্ত। বর্তমানে
ফতুল্লা বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প ও গার্মেন্টস হাব হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য টেক্সটাইল,
ডাইং ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী
এলাকা হওয়ায় এলাকাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এই এলাকাটি
বেশ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সব
সময়ই।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটিতে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্তিশালী
অবস্থান ছিল। তবে আওয়ামী লীগেরও বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। ১৯৮৬ সালে আসনটিতে এমপি নির্বাচিত
হন জাতীয় পার্টির আবদুস সাত্তার। ১৯৯১ সালে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির
নির্বাচনে বিএনপির মোহাম্মদ আলী। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন একেএম
শামীম ওসমান। ২০০১ সালে শামীম ওসমানকে হারিয়ে আসনটিতে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ
গিয়াসউদ্দিন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সারাহ্ বেগম কবরী সারোয়ার আসনটি পুনরুদ্ধার করেন।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি হন শামীম ওসমান।
এবারের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন
জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমী, বিদ্রোহী
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বহিষ্কৃত মোহাম্মদ শাহ আলম,
রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি
মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন (বহিষ্কৃত) এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন, বাসদের সেলিম মাহমুদ,
সিপিবির ইকবাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ইসমাইল কাউসার এবং খেলাফত মজলিসের আনোয়ার
হোসেন মাঠে আছেন।
আসনটির মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩২৫ জন। পুরুষ ভোটার
২ লাখ ৭০ হাজার ১৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৪ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা
১৭৭টি এবং ভোটকক্ষ ১ হাজার ১৪টি। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নেই।
আসনটিতে বিএনপি জোট প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী
এবং বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি শাহ আলমের সঙ্গে লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাশাপাশি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী।
বিএনপি জোট প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী বলেন, আমি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গড়ার জন্য কাজ করব। পরিবারভিত্তিক ফ্যামিলি কার্ড চালু করব, যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষ উপকৃত হয়। এই অঞ্চলের যুবকরা চাকরির সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য কাজ করব। ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি মুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলব। নারায়ণগঞ্জে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে জনগণ তাদের অধিকার পাবে এবং সুশাসন নিশ্চিত হবে।
নারায়ণগঞ্জ-৫
নারায়ণগঞ্জ জেলা শহর ও বন্দরের একাংশ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫
আসন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭ ওয়ার্ড এই আসনের অধীনে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সব
সরকারি, বেসরকারি স্থাপনা এই এলাকাতেই অবস্থিত। পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ নদীবন্দরও
এই এলাকাতে রয়েছে। ফলে শুধু শিল্পাঞ্চল হিসেবে নয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান
এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই এলাকার জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ এক নাম।
সড়ক ও নদীপথ উভয় যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় নারায়ণগঞ্জ শহর
থেকে সহজেই ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে এই এলাকাটি
বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প ও গার্মেন্টস হাব হিসেবে পরিচিত। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা
হওয়ায় এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা এই এলাকাটি বিগত সময়ের আন্দোলন সংগ্রামেও বেশ
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন
একেএম নাসিম ওসমান। ১৯৮৮ সালে দল বদল করে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হন নাসিম ওসমান।
১৯৯১ সালে ধানের শীষ নিয়ে এ আসন থেকে এমপি হন বিএনপির আবুল কালাম। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির
নির্বাচনেও এমপি হন বিএনপির আবুল কালাম। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে আসনটি থেকে
আওয়ামী লীগের প্রার্থী এসএম আকরাম এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে আসনটি থেকে পুনরায়
এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির আবুল কালাম। ২০০৮ সালে আসনটিতে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির নাসিম
ওসমান। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির নাসিম ওসমান এমপি হন। ২০১৪ সালে উপনির্বাচনে
এমপি হন সেলিম ওসমান। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির
মনোনয়নে এমপি হন সেলিম ওসমান।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল
কালাম, গণসংহতি আন্দোলনের তরিকুল ইসলাম সুজন, সিপিবির মন্টু ঘোষ, বাসদের আবু নাঈম খান
বিপ্লব, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাসুম বিল্লাহ, জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের
এবিএম সিরাজুল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন মাঠে আছেন।
আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ২৮২ জন। পুরুষ ভোটার
২ লাখ ৪০ হাজার ৮২০ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫৫ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা
১৬৩টি এবং মোট ভোটকক্ষ ৯৩৪টি।
বিএনপি প্রার্থী আবুল কালাম বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের
সুযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করব। তরুণদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা এবং ফ্যামিলি কার্ডের
মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। আমরা জনগণের পাশে আছি এবং তাদের স্বপ্ন পূরণের
জন্য কাজ করব। দলটির নেতাকর্মীরা আশা করছেন আসন্ন নির্বাচনে জেলার সব আসনেই বিএনপি
বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।
জামায়াতে ইসলামী জোট সমর্থিত প্রার্থী এবিএম সিরাজুল
মামুন বলেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা দূর করা হবে। একটি নতুন প্রশাসনিক
কাঠামো গড়ে তুলতে আমরা সংকল্পবদ্ধ। জনগণের কল্যাণে কাজ করব, যাতে এই অঞ্চলের প্রতিটি
নাগরিক নিরাপদ ও উন্নত জীবন লাভ করতে পারে।