প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৪৩ পিএম
বক্তৃতা দিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিকদের ওপর জনগণের আস্থা তৈরির দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই।’
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জাতীয় নির্বাচন-২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ সংলাপ আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কোনো সরকার এককভাবে দেশের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। কার্যকর সমাধান ও বাস্তব ডেলিভারির জন্য সরকারকে সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি খাত, এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনীতিকদের ওপর জনগণের আস্থা তৈরির দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। বক্তৃতা দিয়ে এই আস্থা তৈরি করা যায় না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।’
ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর অনেক সময় একটি ‘আইসোলেশন বাবল’ তৈরি হয়, যেখানে ক্ষমতা মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন যারা বুঝতে পারবে না, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও সেটি অর্থবহ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান সংকট উত্তরণে একটি সুষ্ঠু, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের জনআকাঙ্ক্ষার পথে দেশ এগোবে কি না, নাকি অতীতের ধারাবাহিকতায় গড্ডলিকা প্রবাহেই সবকিছু চলবে?’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ একই সূত্রে গাঁথা। এই তিন সময়ের ভেতরে যে প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে আমরা বৈপরীত্য দেখি না। কোনো দ্বন্দ্ব দেখি না। আমরা মনে করি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাÑ এ তিন সময়েরই ধারাবাহিক প্রকাশ।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গত দেড় দশকের শাসনকালকে সমালোচনা করে বলেন, মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন একটি গভীর শাসনতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি করেছে। তার মতে, এই সংকটেরই পরিণতিতে জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশ রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। বিচার, নির্বাচন, সংস্কার ও নাগরিক অধিকারÑ এ চারটি বিষয়ে আলোচনার মুখ্য তাগিদ আমরা অনুভব করি এবং গুরুত্ব দিই। এ চার বিষয় সামনে রেখে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন, এই নির্বাচনে কার কথা স্থান পাবে? আগের মতোই সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে কি না?’
ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমাদের সবার সামনে প্রশ্ন আসে, নির্বাচন কি সুষ্ঠু হবে? কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছেÑ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও যেকোনো মাপকাঠিতে তা কি অর্থবহ হবে? আমরা কি কোনো পরিবর্তন পাব? নাকি আবার পুরনো ধারাবাহিকতার ভেতরে গড্ডলিকা প্রবাহে প্রবেশ করব? নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর সেখানে আসবে কি না? ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া বিপন্ন জনগোষ্ঠী এবং দেশের নারী সমাজ আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে স্থান করে নিতে পারবে কি না?
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, আমাদের যে মন্ত্রীরা আছেন, প্রধানমন্ত্রী আছেন, তারা যদি দুর্নীতি করেন, তাহলে জবাবদিহি কে নেবে? দুর্নীতি দমন কমিশন? কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনের যে কমিশনার তাকে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট। আবার প্রেসিডেন্টের এই কাজটা করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে। তাহলে তো আর জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকল না। কারণ যে যার জবাবদিহি নেবে, সেই তাকে নিয়োগ করছে। সেজন্য এখানে জবাবদিহির কাঠামো খুব দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।