মজুমদার ইমরান
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৬ পিএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫১ পিএম
বিএনপি এবার নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে। ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে দলটি এবার বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে এই ইশতেহারে। আর সেই ইশতেহার নিয়ে মাঠে নামবে এ দল। তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ দলের এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছেন বিভিন্ন সেক্টরের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমানের নির্দেশনায় এবার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আটটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়াও ক্ষমতায় গেলে ১০০ দিনের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও থাকবে। ইশতেহারে জনগণের কাছে নতুন চমক দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দিতে চায় বিএনপি। সার্বিক বিবেচনায় একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে চমক দেখানোর মতো কর্মসূচি বা জনসেবার কথা থাকবে ইশতেহারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত নানা কর্মসূচির পরিকল্পনার কথাও থাকবে এতে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘৩১ দফার আলোকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হবে। যেখানে জনগণের জন্য নানা ধরনের উন্নয়নের চমক থাকবে। বিশেষ করে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রারিদ্র্য নিরসন, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি গুরুত্ব পাবে।’
ইশতেহারে এবার প্রতিফলন ঘটবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশ গঠনের পরিকল্পনা। তার সাম্প্রতিক নানা বক্তব্যের মূল দিকনির্দেশনাও ইশতেহারে সংযুক্ত করা হবে। বিশেষ করে যে আটটি বিষয়কে দলটি সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সেগুলো হলোÑ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়ন সেবা। ইতোমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া কর্মসূচি নিয়ে মূল দল এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে বৃহৎ তথ্য-প্রচার কর্মসূচি শুরু করেছে দলটি। যেখানে প্রতিটি সেবার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপকারভোগী হতে পারেন, এমন লোকজনের দোরগোড়ায় যাবেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। তারা এলাকায় এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছে দেবেন। ফলে মানুষ আগেভাগেই জানতে পারবে বিএনপি তাদের জন্য কী পরিকল্পনা করেছে। এতে ভুল তথ্যের সুযোগ কমবে, ভোটাররা নিজেদের ভবিষ্যৎ ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে গুণগত পরিবর্তন আনা হবে, যেখানে ইশতেহার সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে হবে। ভোট দিলে কী পরিবর্তন আসবেÑ এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকবে ভোটারদের সামনে। আর সেই উত্তর হলোÑ বিএনপির ধানের শীষে ভোট মানে জীবনে পরিবর্তন, জীবিকায় উন্নতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আট খাতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভোটের মাঠে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। কারণ বিএনপি কার্ডের ক্ষেত্রে যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে কতগুলো নতুন খাত রয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সুযোগ অবশ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আছে। এগুলো যদি বাংলাদেশে প্রবর্তন করা যায় এবং তাতে যদি সামাজিক খাতে এক ধরনের অগ্রগতি অর্জন হয়, তাহলে সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এক বিরাট সুযোগ তৈরি হবে।
ইশতেহারে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণের মতো বিষয়। দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির অঙ্গীকার। ইশতেহারে বিএনপির ৩১ দফার মূল বিষয়Ñ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে। সূত্র জানাচ্ছে, সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলীয় প্রচারের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে কী কী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে সেখানে নেতারা মতামত দিয়ে কৌশল প্রণয়ন করেছেন। সেই কৌশল অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাকে আলাদাভাবে টার্গেট করবে বিএনপি।
বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবা খাত সম্পর্কে বলা হচ্ছে, প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে এবং সারা দেশে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের অন্তত এক লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। যাতে নারী ও শিশুর সেবা আরও সহজে পাওয়া যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হবে সবার অধিকার, আর তা পৌঁছে যাবে প্রতিটি গ্রাম, শহরের ওয়ার্ড ও মানুষের ঘরের খুব কাছে। শিক্ষায় মুখস্থবিদ্যায় নয়, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নত করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং শিক্ষকদের অবস্থা ও আর্থিক সুরক্ষা উন্নত করা হবে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব যোগসূত্র তৈরি করা হবে, যেন শিক্ষার ফল বাস্তব চাকরি ও উদ্যোগে কাজে লাগে। শুধু সার্টিফিকেট নয়, কাজের দক্ষতা বাড়ানোই হবে বিএনপির মূল লক্ষ্য।
কর্মসংস্থানে এসএমই, ব্লু ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে ব্যাপক নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। যাতে পরিবারে আয় বাড়ে ও অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়। বিএনপি তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গেমিং ও স্টার্টআপ খাতকে কর্মসংস্থানের প্রধান উৎসে পরিণত করবে। একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করে এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্টে পাঠানো হবে। ধর্মীয় নেতাদের সেবায় বলা হয়েছেÑ বিএনপির পরিকল্পনা প্রতিটি খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, পাদরিসহ ধর্মীয় নেতারা মাসিক সম্মানী পাবেন; যাতে তাদের জীবনমান উন্নত হয়। ধর্মীয় উৎসব ও বিশেষ অনুষ্ঠানে আর্থিক সুবিধা ও সহায়তা দেওয়া হবে।
ক্রীড়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ক্রীড়াকে শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবেও গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপি সর্বস্তরে খেলাধুলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। স্কুল ও কলেজে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে এবং পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে নতুন প্রতিভা তৈরি হবে, তরুণরা কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র পাবে এবং সামাজিক ক্ষতি কমবে। পরিবেশ বিষয়ে ইশতেহারে নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং মৌসুমি বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সারা দেশে ২৫ হাজার কিলোমিটার খাল-নদী খনন ও পুনঃখনন করা হবে।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে আর আগের মতো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সে পথেই হাঁটছে।’ তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে পরিবর্তনের সুযোগ। এ পরিবর্তন হতে পারে দায়িত্বশীল রাজনীতি, জনগণের অধিকার এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পথে যাত্রা। সময় এসেছে নীতিনির্ভর রাজনীতির। সময় এসেছে জনগণের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তনের। ইশতেহারে থাকা প্রতিটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সত্যিকার পরিবর্তন আনবে বলে আশা করি।’