খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩২ এএম
খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন গণমানুষের নির্ভরতার প্রতীক। একটি আবেগের নাম। তাই তো জিয়া উদ্যানে তার সমাধি ঘিরে শোকার্ত মানুষের এমন ভিড়। বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি : আলী হোসেন মিন্টু
বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের সফল ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রিয় নেত্রীর সমাধিস্থলে সাধারণ মানুষের ঢল নামে। বৃহস্পতিবার নতুন বছরের প্রথম দিনেও জাতি যেন আনন্দ ভুলে ডুবে আছে শোক, স্মৃতি আর ভালোবাসার গভীর আবেশে। হাতে ফুল, মুখে দোয়া আর অশ্রুসিক্ত নয়নে মানুষ ছুটে আসছেন প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারতে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা মানুষ রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জিয়া উদ্যানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। শীতের ভোর উপেক্ষা করে কেউ এসেছেন বাসে, কেউ ট্রাকে, আবার কেউ দলবেঁধে হেঁটেইÑ একটাই উদ্দেশ্য, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে উদ্যান বন্ধ থাকার পর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে যাওয়ার লেক রোড। জিয়া উদ্যানের প্রবেশমুখ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনে সহযোগিতা করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
কবর জিয়ারতে আসা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ননÑ এমন বহু মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রিয় নেত্রীর সমাধিতে। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু, আবার কারও ঠোঁটে নীরব প্রার্থনাÑ সমাধিস্থল পরিণত হয় এক গভীর আবেগঘন মিলনস্থলে।
এদিন সকালে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরও বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন এবং মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।
দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করেÑ তিনি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছেন। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছি তার জানাজায় শরিক হতে পেরে। আজ যখন তার মাজার জিয়ারতের সুযোগের কথা শুনেছি, তখনই ছুটে এসেছি তার জন্য দোয়া করার জন্য। তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু সেই দলকে প্রকৃত অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। নেতৃত্বের চরম সংকটে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে ধীরে ধীরে দলের নেত্রীতে পরিণত হন এবং দলকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াকু শক্তিতে রূপ দেন।
মিরপুর থেকে আসা মোতালেব মিয়া বলেন, বুধবার রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের জন্য কবর জিয়ারত করতে পারিনি। তাই বৃহস্পতিবার সকালে কবর জিয়ারত করতে এসেছি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এত নির্যাতনের পরও তিনি কখনও মাথা নত করেননি। তিনি চেয়েছেন এ দেশের মানুষ যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। আমরা আমাদের মাকে হারালাম।
চাঁদপুর থেকে আসা তরিকুল ইসলাম বলেন, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের মানুষ নই। বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা ও তার জন্য দোয়া করতে পেরে ভালো লাগছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে আসা তামান্না আক্তার বলেন, খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী নারী নেতৃত্বের প্রতীক। তার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর সম্মান থেকেই আজ দুই সন্তানকে নিয়ে দোয়া করতে এখানে এসেছি। তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব আজও বহু মানুষের অনুপ্রেরণা।
বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার কবরের পাশে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অবিরাম উপস্থিতি যেন নীরবে ঘোষণা করেÑ একজন রাষ্ট্রনায়কের শারীরিক প্রস্থান কখনোই তার আদর্শ, নেতৃত্ব ও প্রভাবকে ম্লান করে দিতে পারে না। সময়ের ব্যবধান যতই বাড়ুক, স্মৃতির গভীরে তিনি রয়ে যান চিরকাল।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।