রয়টার্সকে শফিকুর রহমান
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৩৯ পিএম
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ২৩:০২ পিএম
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: দলটির ওয়েবসাইটের
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভালো ফল পেলে জামায়াতে ইসলামী একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে আগ্রহী। এ লক্ষ্যে দলটি বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনাও করেছে। আর চলতি বছরের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এসব তথ্য উঠে এসেছে বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকারে।
প্রতিবেদনে কিছু দিন আগের জনমত জরিপের তথ্য তুলে বলছে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া জামায়াতে ইসলামী সম্ভবত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঠিক পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে। এর মাধ্যমে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মুসলিম প্রধান দেশটিতে মূলধারার রাজনীতিতে দলটির প্রত্যাবর্তন ঘটছে।
এর
আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশীদার হিসেবে ক্ষমতায়
ছিল জামায়াত। এবারও তারা বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
ঢাকার
জামায়াতের কার্যালয়ে বসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা
অন্তত পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র দেখতে চাই। দলগুলো যদি একমত হয়, তবে
আমরা সবাই মিলে সরকার পরিচালনা করব।”
জুলাই
গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতের
নির্বাচনী সমঝোতা করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জামায়াতে
ইসলামী শরিয়াহ আইনের ভিত্তিতে ইসলামি শাসনের কথা বললেও বর্তমানে তারা নিজেদের রক্ষণশীল
ভিত্তির বাইরে গিয়ে জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। শফিকুর রহমান বলেন, “যেকোনো ঐক্য
সরকারের জন্য দুর্নীতি দমন একটি অভিন্ন এজেন্ডা হতে হবে।”
তিনি
আরও জানান, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, প্রধানমন্ত্রী সেই
দল থেকেই হবেন। যদি জামায়াত সবচেয়ে বেশি আসন পায়, তবে তিনি নিজে পদপ্রার্থী হবেন কি
না, সেটি দল ঠিক করবে।
প্রতিবেদনে
উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার পতনের পর জামায়াতের এই পুনরুত্থান ঘটেছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে বর্তমানে
নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাসিনা জামায়াতের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং তার শাসনামলে
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, জামায়াত সেই যুদ্ধের
বিরোধিতা করেছিল।
দেশের
ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে দলীয় গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ার যুক্তিতে ২০১৩ সাল থেকে
জামায়াতের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের
নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে দলটির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে
নেয়।
শফিকুর
রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান করাটা উদ্বেগের
বিষয়। তার পতনের পর থেকে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন
পর্যায়ে রয়েছে।
দক্ষিণ
এশিয়ার অন্যতম শক্তি হিন্দু প্রধান ভারত শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্ক বজায়
রেখেছিল, যা দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক হয়েছিল।
বর্তমানে
ভারত যখন পরবর্তী সম্ভাব্য সরকার গঠন করতে পারে এমন দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে,
তখন ডা. শফিকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন, তার হার্ট বাইপাস সার্জারির পর চলতি বছরের শুরুতে
তিনি একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে অন্য দেশের কূটনীতিকরা সৌজন্য
সাক্ষাৎ করতে এসে তা প্রকাশ করলেও, ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন
বলে জানান তিনি।
শফিকুর
রহমান প্রশ্ন তোলেন, “কেন? অনেক কূটনীতিকই তো আমার কাছে এসেছেন এবং তা প্রকাশ করা হয়েছে।
সমস্যা কোথায়? আমাদের একে অপরের প্রতি খোলামেলা হতে হবে। সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প
নেই।”
প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, শফিকুর রহমানের এই মন্তব্য বা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ সম্পর্কে ভারতের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারত সরকারের একটি সূত্র বিভিন্ন
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বুধবার ঢাকা সফর করে সদ্যপ্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার
পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের
সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা
সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশের দিকে
ঝুঁকে পড়তে আগ্রহী নই। বরং আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং জাতিগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ
সম্পর্ক চাই।”
তিনি
আরও উল্লেখ করেন, জামায়াত অংশীদার থাকবে এমন কোনো সরকার বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের
অধীনে ‘স্বাচ্ছন্দ্য বোধ’ করবে না। সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিনা
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দেশের
আলঙ্কারিক প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত সাহাবুদ্দিন চলতি মাসেই রয়টার্সকে বলেছিলেন, তিনি
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক। বুধবার টেলিফোনে রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে
তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং বলেন, তিনি বিষয়টিকে “আরও জটিল করতে
চান না”।