× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের রাজনীতির অনিবার্য মানদণ্ড

আজাদ-আল-আমিন

প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৫৬ পিএম

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:২৮ পিএম

বেগম খালেদা জিয়া। আর্টিস্ট: জয়ন্ত জন

বেগম খালেদা জিয়া। আর্টিস্ট: জয়ন্ত জন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক নাম হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া। তার জীবন কেবল ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প নয়। তিনি জড়িয়ে থাকবেন রাষ্ট্রের চরিত্র, সমাজের নৈতিকতা ও ক্ষমতার ভাষার সঙ্গে।

খালেদা জিয়াকে উপেক্ষার সুযোগ দেবে না ইতিহাস। তিনি কেবল একটি দলের নয়; ছিলেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও শালীন রাজনীতির এক মানদণ্ড।

বাংলাদেশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুটি গুণ—ভয় ও প্রলোভনকে অতিক্রমের শক্তি—দুর্লভ। অল্প ভয়ে মাথা নত করা, অল্প দামে বিক্রি হয়ে যাওয়া যেন আমাদের জাতীয় অভিজ্ঞতার অংশ, কিন্তু সে বাস্তবতায় খালেদা জিয়া এক ব্যতিক্রমী উপস্থিতি।

নিজ জীবন, সন্তান, পরিবার, বাড়িঘর, সম্পত্তি সব হারানোর আশঙ্কাকে জয় এবং নত হওয়ার বিনিময়ে ব্যক্তিগত আরাম ও নিরাপত্তা পাওয়ার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে খালেদা জিয়া রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশের স্বার্থে লড়াই করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের কেন্দ্র।

শোক থেকে সংগ্রামে

১৯৮১ সালের ৩০ মে। নির্মম এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সে মুহূর্তে খালেদা জিয়া ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। রাজনীতির কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না তার; ছিল না ক্ষমতার স্বপ্ন, কিন্তু ইতিহাস অনেক সময় ব্যক্তিগত ইচ্ছার তোয়াক্কা করে না।

স্বামীর হত্যার শোক ভেঙে দেয়নি খালেদা জিয়াকে। সে শোকই তাকে পরিণত করেছিল দৃঢ়, সংযত ও আপসহীন রাজনৈতিক সত্তায়।

এরপর আসে এরশাদের সামরিক শাসন। বিএনপি তখন ভঙ্গুর, নেতৃত্বশূন্য ও দিশেহারা। সংকটময় সে মুহূর্তে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল প্রায় অনিবার্য। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তিনি সামনে আসেন। দ্রুতই হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ। সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট: গণতন্ত্র প্রশ্নে নয় আপস।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০—দীর্ঘ এ সময়জুড়ে গ্রেপ্তার, নিপীড়ন, হুমকি তার নিত্যসঙ্গী ছিল, তবুও তিনি পিছু হটেননি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না। সেটি ছিল জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সে ইতিহাসের প্রথম সারিতেই লেখা থাকবে খালেদা জিয়ার নাম।

১৯৯১: বিস্ময় নয়, বাস্তবতা 

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে অনেকেই বিস্মিত হন, কিন্তু এ বিস্ময়ের পেছনে বাস্তব কারণ ছিল। আওয়ামী লীগের অহমিকা, দম্ভ ও একচেটিয়া মনোভাবের বিপরীতে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব ছিল ভিন্ন।
একদিকে দৃঢ় ও আপসহীন, অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে নম্র। দ্বৈত এ বৈশিষ্ট্যই তাকে জনমানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

তিনি ক্ষমতায় এসেই সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক মৌলিক মোড়।

বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস—সব মিলিয়ে তার প্রথম মেয়াদ ছিল রাষ্ট্র গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নারী, শিক্ষা ও নীরব বিপ্লব 

খালেদা জিয়ার শাসনামলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্ভবত নারী শিক্ষায়। মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা ও শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি ছিল এক নীরব সামাজিক বিপ্লব। আজ বাংলাদেশের সমাজে নারী শিক্ষার যে বিস্তৃতি, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তখনই। 

একইভাবে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে তার সরকারের ভূমিকা লাখো নারীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করেছে।

এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার রাজনীতি ছিল না। ছিল ভবিষ্যৎ সমাজ বিনির্মাণের দূরদৃষ্টি।

সার্বভৌমত্ব ও অপপ্রচারের রাজনীতি

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন। ভারতকেন্দ্রিক প্রভাব, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও এক দেশনির্ভর রাজনৈতিক বয়ানের বিপরীতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনমানুষের নিরাপস ঠিকানা।

এ অবস্থানের কারণেই তাকে ‘ইসলামপন্থি’র মতো তকমা দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো তিনি কখনও ধর্ম প্রদর্শনের রাজনীতি করেননি। জীবনাচরণ, পোশাক ও রাষ্ট্রচিন্তায় তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাশীল ও সংযত।

শালীনতার রাজনীতি

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল তিনি কখনও পাল্টা শিষ্টাচার-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে নামেননি। শেখ হাসিনার শাসনামলে সংসদ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসন থেকে যে ভাষাগত অবমাননা, কটূক্তি ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে বিষাক্ত করেছে। অথচ দীর্ঘ এ অপমানের মধ্যেও খালেদা জিয়া শালীনতা ও সৌজন্য ত্যাগ করেননি। আপসহীন হতে গিয়ে তাকে কখনোই ‘আদব’ হারাতে হয়নি।

আজকের দিনে, যখন অসুস্থ ভাষাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে, তখন খালেদা জিয়ার এ সহিষ্ণুতা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ভয়, প্রলোভন ও দীর্ঘ নির্যাতন

২০০৭ সালের এক-এগারো পরবর্তী কারাবাস, সাজানো মামলা, শারীরিক অসুস্থতা—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল দীর্ঘ এক নিপীড়নের ইতিহাস, কিন্তু তিনি আপস করেননি। “বাংলাদেশ আমার একমাত্র ঠিকানা” -এই বাক্য নিছক আবেগ নয়; ছিল সার্বভৌমত্বের এক রাজনৈতিক ঘোষণা।

 সময়ের ঊর্ধ্বে এক নাম

১৯৮৭ সালেও তিনি নন্দিত ছিলেন, ২০২৫ সালেও সমানভাবে নন্দিত। সবসময় তিনি অকুতোভয়, গণতন্ত্র প্রশ্নে আপসহীন। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে তিনি নেতা, এলিটদের কাছে ‘ম্যাডাম’। আপামর জনতার কাছে তিনি দেশনেত্রী। সমালোচকদের চোখে তিনি আপসহীনতার প্রতীক, বিশ্বের দৃষ্টিতে তিনি বাংলাদেশের একজন ‘স্টেটসম্যান’। অনেক পরিচয়ে পরিচিত হয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত একজনই এবং অদ্বিতীয়া।

খালেদা জিয়া নিখুঁত ছিলেন না। তার ভুল ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, সমালোচনার জায়গাও আছে, কিন্তু তিনি কখনোই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেননি, প্রতিহিংসাকে রাষ্ট্রীয় নীতি বানাননি। তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি। রাজনীতি করেছেন ইতিহাসের দায় থেকে।

তার জীবনাবসান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মানদণ্ডই—ভয় ও প্রলোভনকে জয় করে সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়ানো, আপসহীন থেকেও শালীন থাকা—বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রকৃত উত্তরাধিকার। সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিকদের জন্য দিকনির্দেশনা।

খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক নাম নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা