মোহাম্মদ আলম
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:২৮ পিএম
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:২৯ পিএম
দীর্ঘ ১৯ বছর পর সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সতেরো বছর পর দেশে এসে রাজনীতির মাঠে এমন সময় ফিরেছেন, যখন তাকে অল্প সময়ের মধ্যে পার হতে হবে নির্বাচনী বৈতরণী।
একাধিক বিতর্কিত নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ গত বছর গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দেড় বছর পর এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই দেশে গণতান্ত্রিক যাত্রা হবে, এমনই আশা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় ভোটের মাঠে যেসব নির্বাচনী সমঝোতার জোট দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে ভোটে ভালো করতেও নানা চ্যালেঞ্জ দেখবেন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির কান্ডারি।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকা পর ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গিয়েছিলেন তারেক রহমান। গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে দলের সংবর্ধনা মঞ্চে লাখ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গিকার করেছেন ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ গড়ার।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দমন-পীড়ন-নির্যাতন সয়েছেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। বড় দলের প্রধান হিসেবে ষাটোর্ধ তারেক রহমান দলীয় নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলায় আনতে কতটা পারবেন, তাও দেখার অপেক্ষা।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে যারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন, বিদেশে বসেই তারেক রহমান তাদের অনেককেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিভিন্নভাবে শাস্তির আওতায় এনেছেন।
দীর্ঘ সময় লন্ডনে নিরাপদে কাটিয়ে আসা তারেক রহমানের দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তার চ্যালঞ্জও রয়েছে, তবে জনসংযোগের ক্ষেত্রে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতাও হতে পারে।
গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মের যে দাবি-ক্ষোভ, তা দক্ষতার সঙ্গে তাকে সামলাতে হবে।
‘উগ্রপন্থীদের অরাজকতাও’ নির্বাচন ঘিরে চ্যালেঞ্জ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবেই দেশের আইন-শঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই কাছাকাছি আসবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সবার একটাই প্রশ্ন—এতসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করবেন তারেক রহমান?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক ড. আকমল হোসেন মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলে জানগণের ভিতরে আস্থা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কখনোই এতটা অস্থিতিশীল ছিল না। মানুষ নিশ্চিন্তে ঘর থেকে বের হতে পারে না।
“ভবিষ্যতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বা যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য অবশ্যই এই পরিস্থিতি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”
অধ্যাপক আকমল হোসেন বলেন, “৫ আগষ্টের পর থেকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স বা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক।একটি সমাজে যদি কিছু লোক হঠাৎ করে অন্যদের পিটানো শুরু করে, মেরে ফেলে, পুড়িয়ে মারে এটা কোনো সভ্য সমাজের কাজ না।
“এই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতেতে যেকোনো সরকারের জন্যই দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এই ধরনের বিশৃঙ্খলা বিগত ৫৪ বছরে কোনো সরকারই মোকাবেলা করেনি। ভবিষ্যৎ সরকারে তারেক রহমান বা যিনিই নেতৃত্বে আসবেন তাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।”
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসন্ন নির্বাচনের সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তারপরও নির্বাচন নিয়ে জনমনে স্বস্তি ছিল না। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে সংশয় অনেকটাই কেটে গেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গত ২৩ নভেম্বর থেকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপালাতে সংকটাপন্ন সময় পার করছেন। সেই কারণে যেসব আসনে তার প্রার্থিতার কথা ছিল, সেসব স্থানে বিকল্পও ভাবতে হচ্ছে।
প্রত্যাবর্তন
ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, “আই হ্যাভ এ প্লান”। সেই পরিকল্পনা নিয়ে দলীয় পরিসরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা
তৈরি হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “তারেক রহমান তার রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি করে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছেন। আমরা তথা দেশবাসী তার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি।”
গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থী দল হিসেবে বিএনপির কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এখন দেশে পেয়ে তারেক রহমানকে ঘিরে যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছে, তার কতটা পূরণ করতে পারবেন সেটি সময় বলে দেবে। তবে তিনি এরই মধ্যে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে তার বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “তারেক রহমানের উপর নির্যাতন হয়েছে, মায়ের উপর হয়েছে, সহোদর ভাইকে হারিয়েছেন, এত কিছুর পরও তিনি কখনো দেশের মানুষকে ভুলে যাননি। দেশের মানুষের পাশেই আছেন, মানুষের টানেই তিনি দেশে এসেছেন।
“তিনি সব সময় বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ। সেই প্রত্যয় নিয়ে তিনি এসেছেন। তার টানে সারা বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি মানুষ ছুটে এসেছে তাকে এক নজর দেখার জন্য। এটা প্রমাণ করে তার নেতৃত্ব নিরঙ্কুশ এবং দলের ভিতরে তার নেতৃত্বে সবাই ঐকবদ্ধ্য।”
“তিনি বক্তব্যে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তিনি পরিকল্পিতভাবে সাংগঠনিক ও দেশ গড়ার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে এগিয়ে যাচ্ছেন। যদি বিএনপি সরকার গঠন করে তাহলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, মানুষের সাবলম্বী হওয়ার জন্য কর্মমুখী প্রকল্প করা হবে।”
বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে উল্লেখ করেন মনি বলেন, “সময়োপযোগী এমন একটি রূপরেখা শুধুমাত্র বিএনপিই জাতির সামনে প্রকাশ করেছে। মানুষের প্রত্যাশা সাবলম্বী হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি। যেকোনো কাজই হোক না কেন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ছাড়া সাফল্য আসবে না।”