হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৭ এএম
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করা নিয়ে গৃহদাহ শুরু হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি)। দলটির একাংশ বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পক্ষে মতপ্রকাশ করলেও অপরপক্ষ ঝুঁকে পড়েছে জামায়াতের দিকে। এর বাইরে কেউ কেউ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট সামনে রেখে শুধু এনসিপির ব্যানারে নির্বাচন করার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দলের বড় একটা অংশের আপত্তির পরও জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলে প্রকাশ্যে দেখা দিয়েছে দলটির গৃহদাহ। এরই মধ্যে দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ৩০ জন সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে না আসতেই এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির অন্যতম নেতা (জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব) ডা. তাসনিম জারা। তার সঙ্গে তার স্বামী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহও ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন। এভাবে এনসিপির গৃহদাহ তুমুল গৃহদাহে পরিণত হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির বিভিন্ন সূত্র বলছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করা নিয়ে কয়েকদিন ধরেই নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল দলটির মধ্যে। বিশেষ করে, এনসিপির যেসব নেতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পক্ষে ছিলেন, তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। এনসিপির নেতাকর্মীদের অনেকেই বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এনসিপির প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত সে প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো ইতিবাচক উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলের সঙ্গে জোট গড়ে তুললে তা হবে আত্মঘাতী ঘটনা। কেউ কেউ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জোটের প্রার্থী করতে জামায়াতে ইসলামী রাজি হয়নি; কিন্তু তার পরেও জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। দলে বিভক্তি ঘটাবার পেছনে রয়েছে মূলত এই ঘটনা। যার জের ধরে কেউ কেউ পদত্যাগও করেছেন।
তাসনিম জারা ও তার স্বামীর পদত্যাগ
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পরে তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে এক স্ট্যাটাসে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে জানান।
তানসিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনিও দলটি থেকে পদত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে। ‘ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করছি’ বলে গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন খালেদ সাইফুল্লাহ।
তবে এনসিপির একাধিক সূত্রের খবর, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার বিষয়টি মানতে না পেরে তাসনিম জারা পদত্যাগ করেছেন। তাকে ঢাকা-৯ আসনে জোটের প্রার্থী করার আলোচনা ছিল। জারা পদত্যাগ করায় হুমায়রা নুরকে এই আসনে এনসিপির প্রার্থী করা হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে হুমায়রা নুরকে জামায়াতে ইসলামী এই আসন ছাড়বে কি না নিশ্চিত নয়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ নারী নেতাদের অধিকাংশই জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে জোটের বিরুদ্ধে। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, জ্যেষ্ঠ সদস্য সচিব নাহিদ সারোয়ার নিভা, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনুভা জাবীন, যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুমসহ কয়েকজন ইতোমধ্যেই দলের কাছে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল শনিবার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে তাসনিম জারা জানান, তার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্লাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে ঢাকা-৯ আসনের মানুষের ও দেশের সেবা করার। তবে বাস্তব প্রেক্ষাপটে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী তাসনিম জারা ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে গণচাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে ৪৭ লাখ টাকা তুলেছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে এক-শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তিনি ফেসবুক পোস্টে ভোটারদের প্রতি স্বাক্ষর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যারা তাকে নির্বাচনের জন্য চাঁদা দিয়েছিলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
নাহিদ ইসলামকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
জামায়াতে ইসলামীসহ ৮-দলীয় জোটের সঙ্গে এনসিপি রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য। গতকাল শনিবার গুরুত্বপূর্ণ এই নীতিগত বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন তারা। চিঠিতে নেতারা তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা তুলে ধরেন।
চিঠিতে তারা বলেছেনÑ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিগত এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটাজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস) এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রশক্তি বিষয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার, তাদের অনলাইন ফোর্সের মাধ্যমে এনসিপি ও আমাদের ছাত্রসংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্র হননের চেষ্টা এবং সর্বোপরি, ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থানÑ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।’
চিঠিতে নেতারা উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নেতারা বলেন, এর আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একাধিকবার ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় দেড় হাজার মনোনয়নপত্র বিক্রি করে ১২৫ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এখন অল্প কিছু আসনের জন্য কোনো জোটে যাওয়া জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে তারা মনে করছেন।
চিঠিতে এনসিপির নেতারা আরও বলেছেন, ‘আমরা অত্যন্ত আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করেছি, যখনই এই জোটের সম্ভাবনার খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে এসেছে, এর পরপরই আমাদের সমর্থনে থাকা কর্মী-সংগঠকসহ একটা বড়সংখ্যক মানুষ আমাদের দলের প্রতি তাদের সমর্থন সরিয়ে নিতে উদ্যত হয়েছেন। যদি আমাদের সমর্থন করা মধ্যপন্থী এবং নতুন রাজনীতি প্রত্যাশা করা মানুষেরা সমর্থন সরিয়ে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পার্টির মধ্যপন্থী সমর্থক ভিত্তি হারাব।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিটিতে আরও বলা হয়, নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে কৌশল নির্ধারিত হওয়া উচিত, কৌশলগত কারণে নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মো. মুরসালীন, সংগঠক রফিকুল ইসলাম আইনী প্রমুখ।
এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এনসিপির প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত গত ১০ মাসের অভিজ্ঞতায় আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে এই দল ও দলের নেতারা সে প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনা দেখে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলাম, তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। দল ও বড় অংশের নেতারা ভুল পথে আছেন বলেই মনে করি আমি। এই ভুল পথে আমি চলতে পারি না। এই মুহূর্ত থেকে এনসিপির সঙ্গে আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকবে।’
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে এনসিপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।