× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রয়টার্স, এএফপি ও ইন্ডিপেন্ডেন্টে সাক্ষাৎকার

হাসিনা ক্ষমা চাইবেন না, ভারতেই থাকবেন

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ২০:৪৪ পিএম

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ২১:২৬ পিএম

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না, ভারতেই থাকবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল সংখ্যক নাগরিককে হত্যার ঘটনায় ক্ষমা চাইতেও অস্বীকার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। আগামীতে দল, সরকার বা রাজনীতির নেতৃত্বে হাসিনা বা তার পরিবারের কেউ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম বলেও তিনি আভাস দিয়েছেন।

বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপি, রয়টার্স ও ব্রিটিশ সংবাদপত্র ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ভূতপূর্ব স্বৈরশাসক এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারগুলো তিনি ই-মেইলে পাঠিয়েছেন বলে জানানো হয়। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন, এবং এখনো সেখানেই থাকছেন। ক্ষমতাচ্যুতির পর এই প্রথম তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দিলেন।    

 

রয়টার্সকে হাসিনা: আ. লীগ অংশ নিতে না পারলে কোটি ভোটার ভোট বর্জন করবে

হাসিনা বলেছেন, তার দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের আমলে তিনি দেশে ফিরবেন না এবং ভারতে থাকবেন।   

হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে এবং তারা আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা শুধু অন্যায়ই নয়, এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত,’ হাসিনা বলেন রয়টার্সকে পাঠানো ই-মেইল সাক্ষাৎকারে; এটি ছিল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার প্রথম গণমাধ্যমে বক্তব্য।

তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তী সরকারকে অবশ্যই নির্বাচনী বৈধতা পেতে হবে। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। বর্তমান অবস্থায় তারা ভোট দেবে না। একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাইলে কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’  

 

হাসিনার আশা আ. লীগ আবার নির্বাচনে অংশ নেবে

বাংলাদেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৬১ লাখ। স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিএই দুই দলই দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে। আগামি নির্বাচনে বিএনপি জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন গত মে মাসে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। এর আগে ইউনূস-নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্তের কথা উল্লেখ করে দলের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

হাসিনা বলেন, ‘আমরা আমাদের ভোটারদের অন্য কোনো দলকে সমর্থন দিতে বলছি না। আমরা এখনও আশা করি, সাধারণ জ্ঞান ও ন্যায়বোধের জয় হবে, এবং আমাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে।’

তিনি বলেননি, তার পক্ষ থেকে কেউ বা তিনি নিজে সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন আলোচনা চালাচ্ছেন কি না।

রয়টার্সের অনুরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা কোনো মন্তব্য করেননি।

হাসিনা, যিনি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের অভিযোগে অভিযুক্ত, ২০২৪ সালে চতুর্থবারের মতো টানা সরকার গঠন করেন; যদিও বিতর্কিত সেই নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল বর্জন করেছিল, তাদের শীর্ষ নেতারা তখন কারাগারে বা নির্বাসনে ছিলেন।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার কার্যক্রম শেষ করেছে। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়, যা ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা।

অভিযোগ রয়েছে, হাসিনা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গোপন আটক কেন্দ্রে বিরোধী কর্মী ও ভিন্নমতের মানুষদের গুম ও নির্যাতনের নির্দেশ দেন। তার বিরুদ্ধে ওই মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৩ নভেম্বর।

হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সহিংসতা বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না।

তিনি বলেন, ‘এই বিচার কার্যক্রম সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক। এগুলো তথাকথিত ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টে’ পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে রায় আগেই ঠিক করা। আমাকে যথাযথ নোটিশও দেওয়া হয়নি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও পাইনি।’

 

আপাতত দেশে ফেরার পরিকল্পনা নেই

রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবে, সরকারে বা বিরোধী দলে; এবং সেটি তার পরিবার নেতৃত্ব দেবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

তার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে থাকেন, গত বছর রয়টার্সকে বলেন, দল চাইলে তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বিবেচনা করবেন।

হাসিনা বলেন, ‘এটা আসলে আমার বা আমার পরিবারের বিষয় নয়। বাংলাদেশকে আমরা যে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চাই, তার জন্য দরকার সংবিধানসম্মত শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতি। একজন ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণ করে না।’

হাসিনা বলেন, তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তিন ভাইকে ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয়, যখন তিনি ও তার বোন দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি জানান, দিল্লিতে এখন তিনি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করেন, তবে পারিবারিক ইতিহাসের কারণে সর্বদা সতর্ক থাকেন।

কয়েক মাস আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদক শেখ হাসিনাকে দিল্লির ঐতিহাসিক লোধি গার্ডেনে হাঁটতে দেখেন। তার সঙ্গে ছিলেন দুইজন দেহরক্ষী সদৃশ ব্যক্তি। পরিচিত কয়েকজনকে তিনি হালকা মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানান।

‘আমি দেশে তখনই ফিরব যখন বৈধ সরকার হবে, সংবিধান কার্যকর থাকবে এবং প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে,’ বলেন তিনি।


দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে হাসিনা: ‘আমি দায়ী নই, এ বিচার প্রহসন’

গত বছরে জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে হত্যা, দমন-নিপীড়নের ঘটনায় ক্ষমা চাইবেন না বলে জানিয়েছেন হাসিনা। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই মৃত্যুর দায় তার নয় এবং তার বিরুদ্ধে চলা বিচার একটি রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক প্রহসন।

আইসিটির প্রসিকিউটররা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ছাত্রদের আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেন, যাতে প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয়।

ক্ষমা চাইবেন কি নাএই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি শোকাহত। তাদের প্রতি আমার সমবেদনা অব্যাহত থাকবে।’

তবে ‘আমি কখনও পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিইনি।’ তার দাবি, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তার দল আওয়ামী লীগকে অন্যায়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।

হাসিনা বলেন, আইসিটি তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও তিনি ‘বিস্মিত বা ভীত হবেন না’, কারণ এটি ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে সাজানো একটি ভুয়া বিচার। ‘এই আদালত অনির্বাচিত সরকারের অধীনে পরিচালিত, যেখানে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বসে আছে,’ তিনি বলেন।

হাসিনা বলেন, ‘তারা আমাকে সরাতে যেকোনো কিছু করতে পারে। আমাদের ইতিহাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যে নোংরা ঐতিহ্য, এই বিচার তারই ধারাবাহিকতা।’

তিনি বলেন, গত বছরের আন্দোলন ছিল ‘সহিংস বিদ্রোহ’। তিনি কোনো হত্যার দায় তার নয় বলে দাবি করেন। তার ভাষায়, ‘মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণেই হতাহতের সংখ্যা বেড়েছিল। নেতা হিসেবে আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, কিন্তু গুলি চালানোর নির্দেশ আমি দিয়েছিএটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

তিনি আরও দাবি করেন, প্রথম দিকের মৃত্যুর ঘটনায় তার সরকার একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, যা পরবর্তীতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ করে দেয়।

গত বছরের আন্দোলনের দমনপীড়ন বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক উপপরিচালক বাবুরাম পান্ত সে সময় বলেছিলেন, ‘যেভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, তা প্রমাণ করে, প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সহনশীলতা একেবারে শূন্য।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফোলকার তুর্কও সে সময় বলেছিলেন, ‘ছাত্র আন্দোলনের ওপর এ ধরনের হামলা চমকে দেওয়ার মতো এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

হাসিনা আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, ‘১,৪০০ নিহতের সংখ্যা আইসিটির প্রচারণার জন্য সুবিধাজনক, কিন্তু বাস্তবে এটি বাড়িয়ে বলা হয়েছে।’

এই ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন শুরু হয়েছিল গত বছরের জুলাইয়ে, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কোটা বাতিলের দাবিতে। দ্রুত তা সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামে। দমননীতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ; শত শত মৃত্যু ঘটে। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেয়শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা থামবে না।

হাসিনা বলেন, ‘সরকার সে সময় সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করেছিল, যাতে প্রাণহানি যতটা সম্ভব কম হয়।’

প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনাকে বর্ণনা করেছেন ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান স্থপতি’ হিসেবে।

কিন্তু হাসিনার দাবি, ওই সহিংসতা ছিল ‘মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ফল’, সরকার থেকে দেওয়া কোনো নির্দেশ নয়। ‘এই অভিযোগগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত সাক্ষ্য ও বিকৃত প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা অনির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সাজানো হয়েছে,’ তিনি বলেন।

হত্যার ঘটনায় নিজের দায় এড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়ী করে হাসিনা বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাই তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাদের নির্দেশনামায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি আছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে কিছু সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে।

গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে হাসিনা বলেন, ‘এটি ছিল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। দেশে থাকলে শুধু আমার জীবন নয়, আমার আশপাশের মানুষের জীবনও বিপন্ন হতো।’

নিজের উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, তিনি চান মানুষ তাকে সেই নেতা হিসেবে মনে রাখুক, যিনি ‘নব্বইয়ের দশকে সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন’ এবং ‘লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন’। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘আমার সেই অর্জনগুলো এখন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।’

 

এএফপির সাক্ষাৎকার: নির্বাচনে গভীর বিভেদের আশঙ্কা হাসিনার

 

আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা মানে দেশের ভেতরে আরও গভীর বিভেদের বীজ বপন করা; এটি হবে তার পতনের পর প্রথম নির্বাচনএটি শেখ হাসিনার মন্তব্য।

এএফপিকে দেওয়া লিখিত উত্তরে হাসিনা বলেন, তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার একটি ‘আইনগত প্রহসন’, এবং তিনি বিশ্বাস করেন, তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় ‘আগেই ঠিক করা’ হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। জনতার রোষের মুখে হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করেন। সেসময় বিক্ষুব্ধ জনতা তার প্রাসাদে ঢুকে পড়ে। ৭৮ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী তখন থেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাকে আশ্রয় দিয়েছে তার পুরোনো মিত্র ভারত।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকার শেষ প্রচেষ্টায় তার নির্দেশে পরিচালিত দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়যে হত্যাকাণ্ডগুলো এখন তার বিচার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে।

হাসিনা সতর্ক করেন, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আওতায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত নির্বাচনের আগে এটি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগসহ সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে ইউনূস দেশের ভবিষ্যৎ বিভেদের বীজ বপন করছেন। বাংলাদেশের জনগণ যাতে প্রকৃত পছন্দ করতে পারে, সে জন্য তাকে অবশ্যই আওয়ামী লীগকে পুনর্বহাল করতে হবে।’

 

‘মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ’

বহু বছর ধরেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হত্যা, বিরোধী দল দমন, আদালত নিয়ন্ত্রণ ও একপেশে নির্বাচনসহ নানা নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এসেছে।

চলতি বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই পদক্ষেপকে আখ্যা দিয়েছে ‘দমনমূলক ও বিপজ্জনক’ হিসেবে।

হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দরকার প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সব দলের প্রচারাভিযান চালানোর স্বাধীনতা, এবং জনগণের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার। নির্বাচন হচ্ছে ভাবনার প্রতিযোগিতা। কোনো দলের নীতির সঙ্গে আপনি একমত নন বলে তাকে সমাজচ্যুত করা যায় না।’

হাসিনার পতনের পর তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এগিয়ে, আর ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীও জনপ্রিয়তায় উত্থান ঘটাচ্ছে।

অন্যদিকে, হাসিনা আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে এখনো দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলায় সম্মত হননি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগছাত্র আন্দোলন দমনকালে নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস অভিযান পরিচালনায় তিনি ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বহন করেন, যা বাংলাদেশের আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘হাসিনাই সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার চারপাশে সব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।’ দোষী প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানানো হবে।

হাসিনা তার বিরুদ্ধের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও প্রমাণবিহীন দাবি করে বলেন, ‘আমাকে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে বিচার করতে একটি অনির্বাচিত প্রশাসনযেখানে আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাই আছেএই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে।’ ১৩ নভেম্বর এই মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা।

‘দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় আগেই লেখা হয়ে গেছে। যখন সেটি ঘোষণা হবে, আমি আশ্চর্য হব না,’ বলেন হাসিনা।

 

‘জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিইনি’

হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তাকে রক্ষা করছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি কেবল এমন একটি প্রক্রিয়াকেই স্বীকৃতি দেবেন, যা ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো নিরপেক্ষ’।

‘আমি ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালাতে বলেছিএ অভিযোগ মিথ্যা,’ বলেন হাসিনা। তবে স্বীকার করেন, ‘কমান্ড চেইনের মধ্যে কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছিল।’

অভিযোগপক্ষ দাবি করছে, তারা পুলিশের যাচাইকৃত অডিও টেপ বাজিয়েছে যেখানে হাসিনা নিজেই নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার’ করতে বলেছেন। হাসিনার দাবি, রেকর্ডিংগুলো ‘প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে’ উপস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি তার পতনের পর সমর্থকদের ওপর চলমান দমন অভিযান নিয়েও অভিযোগ করেন। ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলতারা দেশকে ‘অস্থিতিশীল করার চেষ্টা’ করছিল। তবে তিনি কিছুই বলেননি সেই হাজারো নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে, যারা তার শাসনামলে গুম হয়ে গোপন আটককেন্দ্রে বন্দি ছিলেন, হারিয়ে গিয়েছিলেন বলে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেই বিষয়ে।

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা