প্রান্ত কুমার দাশ, রাবি
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৩১ এএম
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ১১টি প্যানেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। তবে এতগুলো প্যানেল মাঠে থাকলেও ভিপি-জিএস-এজিএসের মূল লড়াই চারটি প্রধান শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা করছেন ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনীতি সচেতন মহল।
এবারের রাকসু নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ১১টি প্যানেল হলোÑ সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট, ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম, গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ, সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ, রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ, আধিপত্যবিরোধী ঐক্য, সচেতন শিক্ষার্থী পরিষদ ও অপরাজেয় ৭১ অপ্রতিরোধ্য ২৪। এ ছাড়া রয়েছে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী জোট, ইউনাইটেড ফর রাইটস এবং ইনডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্সের মতো স্বতন্ত্র জোট।
বিশ্লেষকদের মতে, প্যানেল বেশি হলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রশিবির-সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট, ছাত্রদল-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের আধিপত্যবিরোধী ঐক্য এবং রাকসুর ইতিহাসে প্রথম নারী ভিপি প্রার্থীর নেতৃত্বে সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের মধ্যে। এ ছাড়াও আলোচনায় রয়েছে আরও দুটি প্যানেলÑ বাম সংগঠনগুলোর গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ ও ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশনের সমন্বয়ে গঠিত রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সংরক্ষিত ভোট ব্যাংক আছে। তাই নির্বাচনের মূল লড়াই হবে মূলত রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্যানেলগুলোর মধ্যে। আবার নির্বাচনের ভোটারদের একটা বড় অংশ হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী। সমন্বয়করাও ক্যাম্পাসে একটা ভালো অবস্থান গড়ে তুলেছে। তারা যদি এই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজেদের পক্ষে টানতে পারে তাহলে তারা একটা ভালো লড়াই দেবে বলে আমি মনে করি।
ভোটারদের নজর কাড়তে প্রতিটি প্যানেলই নিজেদের প্রার্থী তালিকায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছে। ছাত্রশিবির তাদের প্যানেলে সহসভাপতি (ভিপি) পদে সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোস্তাকুর রহমানকে রাখলেও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজাকে মনোনয়ন দিয়েছে।
জিএস পদে সোচ্চার স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক নামের একটি সংগঠনের সভাপতিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও প্যানেলে নারী ও সনাতন ধর্মের প্রার্থী রেখে চমক তৈরি করেছে তারা।
শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আমাদের প্যানেলের শক্তি ‘ইনক্লুসিভিটি’ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)। শিবির করুক বা না করুক, একজনের যেন দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকে, লিডারশিপ কোয়ালিটি (নেতৃত্ব গুণ) দেখেই প্যানেলে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ছাত্রদলও তাদের প্যানেলে ক্লিন ইমেজের নেতাদের প্রার্থী করেছে। ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম নামে তাদের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে লড়াই করবেন সংগঠনটির সহসভাপতি শেখ নূর উদ্দিন আবীর। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে লড়বেন সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক নাফিউল ইসলাম জীবন।
ছাত্রদল শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় নার্গিস খাতুনকে ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক পদে মনোনয়ন দিয়েছে। এ ছাড়াও দলটি ডিনস্ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসের সংগীতব্যান্ড সদস্যকেও প্যানেলে রেখেছে।
ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবির বলেন, ‘পদভেদে যে ব্যক্তি যেখানে তার যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন আমরা প্যানেলে তাদেরকেই বাছাই করেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
এই দুই ছাত্র সংগঠনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেল। এই প্যানেলে ভিপি প্রার্থী হিসেবে লড়বেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব এবং জিএস ও এজিএস পদে লড়বেন আরও দুই সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার এবং আকিল বিন তালেব।
প্যানেলটির জিএস পদপ্রার্থী সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমাদের শক্তি আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থী। তারা যাকে বেছে নেবে আমরা তাকেই মেনে নেব।’
অন্যদিকে সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ নামক প্যানেলে ভিপি পদে লড়বেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাবির আরেক সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসুর ইতিহাসে প্রথম নারী ভিপি প্রার্থী তাসিন খান। এই প্যানেলে জিএস পদে লড়বেন ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাজন আল আহমেদ। বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় শিক্ষার্থীদের কাছে তারা পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
প্যানেলটির ভিপি পদপ্রার্থী তাসিন খান বলেন, ‘রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর যতই কর্মী সমর্থক থাকুক না কেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে বেশি নয়। তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট ব্যাংক থাকলে আমাদের ভোট ব্যাংক সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাকসুর ইতিহাসে বাম সংগঠনগুলোর ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও বর্তমানে ক্যাম্পাসে বাম সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক সীমিত। তবে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সংগঠন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, বেতন-ফি বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যুতে কর্মসূচি পালন করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে আসছে। রাকসু নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে জোট করে প্যানেল দিয়েছে। তাদের গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ নামে প্যানেলে ভিপি প্রার্থী হয়ে লড়বেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল এবং জিএস পদে ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) কাউসার আহমেদ ও এজিএস পদে ছাত্র গণমঞ্চের আহ্বায়ক নাসিম সরকার লড়বেন।
আলোচনায় আছে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট আরও একটি প্যানেল রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ। ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত এই প্যানেলে ভিপি পদে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ এবং জিএস পদে লড়বেন উত্তরণ লেখক ও পাঠক সূতিকাগারের সাবেক সভাপতি আফরিন জাহান।
বাকি ৫টি প্যানেলের মধ্যেÑ ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মাহবুর আলম লড়বেন ভিপি পদে। আর জিএস পদে সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম শরীফ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের অপরাজেয়-৭১, অপ্রতিরোধ্য-২৪ প্যানেলে ভিপি পদে লড়বেন সংগঠনটির সভাপতি মাসুদ কিবরিয়া। আর জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পরমা পারমিতা।
অপরদিকে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী জোট প্যানেলে ভিপি পদে তাওহিদুল ইসলাম আর জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন নুসরাত জাহান নুপুর। নওশীন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমন্বয়ে আরও দুটি আংশিক প্যানেল ঘোষণা হয়। ইনডিপেনডেন্ট স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স প্যানেলের ভিপি পদে আছেন আশিকুল্লাহ মুহিব। জিএস পদে আবদুল মুকিত। অন্যদিকে ইউনাইটেড ফর রাইটস নামে ভিপি, জিএস ও এজিএস ছাড়াই ১১ সদস্যের আরেকটি প্যানেল ঘোষণা করে একদল প্রার্থী।