ডাকসু-জাকসু নির্বাচন
মজুমদার ইমরান
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৪১ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভূমিধ্স বিজয় পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে বর্জন করেছে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। তাদের অভিযোগ, শিবির সমর্থিত প্যানেলকে জেতাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেছে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের এমন বিপর্যয়কে বিএনপি বিস্ময়কর বলেই মনে করছে। শিবিরের এমন একচেটিয়া বিজয়ে অনেকটা হতভম্ব ও বিস্মিত বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তবে বিস্মিত হলেও এই ফলাফলে চিন্তিত নয় দলটি।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ডাকসু নির্বাচনের ফল দলের জন্য সর্তকবার্তা হলেও তা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপকালে তারা দলের এমন মনোভাবের কথা জানান। বিএনপি নেতারা জানান, জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব না পড়লেও তারা ডাকসু নির্বাচনের ফল পর্যালোচনা করছেন। ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা ও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও তারা জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক বলেন, ‘গত ১৫ বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হতে পারেনি। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হত্যা, গুমসহ নানা ধরনের নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদলের সহ-অবস্থান ছিল না। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা গুপ্ত রাজনীতি করেছে। ছাত্রলীগের কমিটিগুলোতে স্থান নিয়ে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান করেছে। তারা রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে। এসব ফ্যাক্টর ডাকসু নির্বাচনের ফলে প্রভাব ফেলেছে।’
ডাকসু, জাকসুসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের নাজুক অবস্থার বিপরীতে ছাত্রশিবিরের শক্ত অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে বা সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে কি নাÑ এ নিয়েও আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। ডাকসু নির্বাচনে ভোটের নানা সমীকরণও মেলানোর চেষ্টা করছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। তাদের সামনে নানা প্রশ্ন হাজির হয়েছে। বিশেষত বিএনপি ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থা; প্যানেল নির্বাচনে কোনো সমস্যা ছিল কি না; ছাত্ররা কীসের ভিত্তিতে ছাত্রশিবিরকে ভোট দিল ইত্যাদি।
জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনের দিন অর্থাৎ গত মঙ্গলবার রাতে স্থায়ী কমিটির সভায় ডাকসু নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করেন। দলটির নীতিনির্ধারকরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। ওই বৈঠকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সর্মথিত প্যানেলের অবস্থা সুবিধাজনক নয় বলে অবহিত করা হয়। এমনকি ডাকসু নির্বাচনে নেতিবাচক ফলাফল হলেও এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির নেতারা ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের দুর্বলতা যেমন দেখছেন তেমনি প্রতিপক্ষ, অর্থাৎ বিজয়ীদের কৌশলও খুঁজে দেখছেন। তারা মনে করেন, ছাত্রশিবির যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচন করেছে। অন্যদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ছাত্রদলের যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। ডাকসুতে ও হলে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করছেন, ছাত্রশিবির নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সমর্থন পেয়েছে। না হলে তারা এত ভোট পেল কীভাবে, সে প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথাও বলছেন অনেকে।
এদিকে ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু নির্বাচনে পরাজয়ের পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা পরিস্থিতি ও ফলাফল পর্যালোচনায় বৈঠক করেছেন। সংগঠনটির মধ্যম সারির নেতারা মনে করেন, সমন্বয়হীনতা, গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভরাডুবি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, ছাত্রশিবির প্রশাসনের সহায়তা যেমন পেয়েছে তেমনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের প্রচার-প্রচারণা ও নির্বাচন হ্যান্ডেল করেছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের পাল্টা কোনো কৌশল ছিল না, ছিল না সমন্বয়ও।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বিএনপিকে বিব্রত করেছে সত্যি তবে এই নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না।’
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এখানে কেউ হারবে, কেউ জিতবে। কিন্তু ফলাফল মেনে নিতে হবে।’
বিএনপির এই নীতিনির্ধারক আরও বলেন, ‘আমরা দেশে ফ্যাসিবাদমুক্ত রাজনীতি চাই। ছাত্ররাজনীতি দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে পরিচালিত হবে বলে আশা করি।’
ছাত্রশিবির নামে কেউ ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারা ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট নামে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। জাতীয়বাদী ছাত্রদল দলীয় ব্যানারে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। কেউ কেউ স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য নামে নির্বাচন করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নামে করেছে। কিন্তু যারা জয়ী হয়েছেন তাদের প্যানেলের নাম ছিল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট।’
ডাকসু নির্বাচনে বেশকিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল বলে দাবি করেন বিএনপির এই নীতিনির্ধারক।