প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৩৭ পিএম
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৮ পিএম
ব্রিটিশ স্বতন্ত্র এমপি আপসানা বেগম ও এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক এহতেশামুল হক
হাউজ অফ কমন্সে এক আবেগঘন বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ স্বতন্ত্র এমপি আপসানা বেগম। বক্তব্যে তিনি তার সাবেক স্বামী, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন। পপলার এবং লাইমহাউসের এই এমপি "ডিউটি অফ কেয়ার" বা 'যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব' নিয়ে বিতর্কের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিয়োগকর্তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত পারিবারিক সহিংসতার শিকারদের সুরক্ষা দেওয়া।
এমপির অশ্রুসিক্ত বক্তব্যটি সাবেক এই দম্পতির শেষ হওয়া সম্পর্কের ব্যাপারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দশ বছর আগে ২০১৫ সালে তাদের ডিভোর্স হয়। দুজনই লন্ডনের বাংলাদেশি-অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের পরিচিত মুখ। আগামী নির্বাচনে তারা একই আসনে আবারও প্রার্থী হবেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে তারা দুজন দুটি ভিন্ন দেশ থেকে দুটি নতুন দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
গত বছর লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হওয়া আপসানা বেগম পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেন, তার সাবেক সঙ্গী তার বিরুদ্ধে হয়রানির একটি অভিযান পরিচালনা করছেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, তার সাবেক স্বামী তাকে "উন্মোচন" করার লক্ষ্য নিয়ে তার নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। আপসানা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "আমি তার সহযোগীদের একটি চক্র দ্বারা একজন এমপি হিসেবে আমাকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করার নিরন্তর চেষ্টার পাশাপাশি এই ধরনের হয়রানি সহ্য করে চলেছি।" তিনি এর প্রভাবকে "বিধ্বংসী" এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্যাসলাইটিংকে "ভয়ংকর" বলে বর্ণনা করেন।
তার সাবেক স্বামী এহতেশামুল হক এর আগে সব ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার প্রার্থীতার সময় তিনি ডেইলী ড্যাজলিং ডনকে বলেছিলেন, "আপসানার প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। আমি তাকে আমার সাবেক স্ত্রী হিসেবে সম্মান করি। কিন্তু এমন কোনো আইন নেই যা বলে যে আমার সাবেক স্ত্রী আমার আসনের এমপি হওয়ার কারণে আমি একজন সাবেক কাউন্সিলর ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সেখানকার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে বা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারব না।"

গত বছরের ৪ জুলাই অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে লেবার পার্টির এমপি আপসানা বেগম তার সাবেক স্বামী এহতেশামুল হকের স্বতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এহতেশামুল হক এর আগে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের নির্বাচনে হেরেছিলেন। ওই নির্বাচনে আপসানা বেগম লেবার পার্টি থেকে ১৮,৫৩৫ ভোট পান, আর স্বতন্ত্র প্রার্থী এহতেশামুল হক পান মাত্র ৪,৫৫৪ ভোট। তার বর্তমান স্ত্রী লেবার পার্টির কাউন্সিলার কিছুদিন আগে লেবার পার্টি ছেড়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমানের এস্পয়ার পার্টিতে যোগ দেন।
গত নির্বাচনে আপসানার বিরুদ্ধে এহতেশামের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিউনিটিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, যেখানে আপসানার অনেক সমর্থক দাবি করেন যে, তার জয়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও তিনি শুধু বিরোধিতার জন্যই প্রার্থী হয়েছিলেন।
এই ব্রিটিশ বাংলাদেশি দম্পতির ২০১৩ সালের বিয়ে এবং পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। দুজনেরই পৈতৃক নিবাস সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায়। ৩৫ বছর জন্ম ও বেড়ে ওঠা টাওয়ার হ্যামলেটসের শ্যাডওয়লে। বাংলাদেশে তার বাবার বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। আফসানার বাবা মনির উদ্দিন টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর ছিলেন।
২০১৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২০২০ সালে টুইটার (বর্তমান এক্স) প্ল্যাটফর্মে আপসানা অভিযোগ করেন যে, তিনি পারিবারিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আপসানা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতন বিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের তিনটি ঘটনার জন্য আপসানার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। তবে, ২০২১ সালের ৩০ জুলাই আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, এই অভিযোগগুলো তার সাবেক স্বামীর সাথে জড়িত একটি বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার অংশ ছিল।
সাবেক এই দম্পতি এখন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পথে রয়েছেন। জেরেমি করবিনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আপসানা নতুন একটি দলের হয়ে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে, যার নেতৃত্ব তিনি দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, তার সাবেক স্বামী এহতেশামুল হক বাংলাদেশে সম্প্রতি সরকার পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন দল এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি এমপি হওয়া নয় দল গোছাতে চান। তার সাবেক স্ত্রীর সর্বশেষ সংসদে দেয়া বক্তব্যের বিষয়ে শুক্রবার দুদফায় যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, আপসানা বেগমের এই বক্তব্য পার্লামেন্টের অন্য সদস্যদের মধ্যেও সাড়া ফেলে। লেবারের স্টেলা ক্রিসিসহ অন্য এমপিরা তাকে সহানুভূতি জানান। কমন্স লিডার লুসি পাওয়েল আপসানা বেগমের সাহসের প্রশংসা করেন এবং নিশ্চিত করেন যে, আসন্ন একটি নির্বাচন বিলে প্রার্থীর উপযুক্ততা এবং আচরণ নিয়ে আলোচনা হবে।