× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আচরণবিধি মানতে অনীহা, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি

হাসনাত শাহীন ও মাহরিব বিন মহসিন

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:২০ এএম

নির্বাচনী প্রচারে এমনই মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি দিন। বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি : আলী হোসেন মিন্টু

নির্বাচনী প্রচারে এমনই মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি দিন। বৃহস্পতিবার তোলা। ছবি : আলী হোসেন মিন্টু

আগামী ৯ সেপ্টেম্বর হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এটি সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিভিন্ন প্যানেল ঘোষণা করেছে তাদের প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার। এতে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অসঙ্গতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়। কার ইশতেহারের সঙ্গে কার কী মিল-অমিল তা-ও উঠে এসেছে। 

এদিকে আচরণবিধি মানতে প্রার্থীদের শৈথিল্যও লক্ষণীয়। অঞ্চল ও ব্যাচভিত্তিক ভোটারদের নিয়ে প্রতি রাতেই বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রচারণায় বহিরাগতের উপস্থিতি, প্রার্থীদের পোস্টার বিকৃত করার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। 

ইশতেহার কেবল যাতে ফাঁকা বুলি না হয়, বরং নির্বাচনের পরে প্রার্থীরা তা বাস্তবায়ন করবেনÑ সে প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী সিফাত ভুঁইয়া বলেন, অনেকে অতিরঞ্জিত ইশতেহার দিচ্ছে। 

কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান বলেন, ভোট চাইতে এসে অনেকেই অনেক কথা বলছেন, নানা প্রতিজ্ঞা করছেন। নির্বাচিত হলে সেই প্রতিজ্ঞা কতটা বাস্তবায়ন করবেনÑ সেটাই দেখার বিষয়। 

ডাকসু নির্বাচনের ইশতেহার ও তার বাস্তবায়ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা লিটন নন্দী বলেন, ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিক দিয়ে যেকোনো নির্বাচনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ডাকসু নির্বাচন ঘিরেও ছাত্রদের বিভিন্ন প্যানেল ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ভালো ভালো কথা বলেছে। কিন্তু চাইলেই এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা অনেকাংশে সম্ভব নয়। কারণ গঠনতন্ত্র অনুসারে ডাকসুর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের যে পরিমাণ ক্ষমতা তা নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিদের ডিঙিয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বড়জোর স্টুডেন্টদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলে তা সিনেটে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে তুলে ধরে বাস্তবায়নের দাবি জানাতে পারে। এখানে কারও নিজের কিছু করার এখতিয়ার বা ক্ষমতা নাই। 

টিএসসি প্রাঙ্গণে এ বিষয়ে আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন আর রশিদ বলেন, ডাকসুতে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের প্রার্থীরা নানা ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এর মাধ্যমের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অসঙ্গতি উঠে আসছে। এটা ভালো দিক। কিন্তু তারা ইশতেহার সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করি না। যদি তাদের খুব সদিচ্ছা থাকে এবং যে প্যানেল থেকেই আসুক না কেন; যদি একতাবদ্ধ হয়ে ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে চাপ দিতে পারে; তাহলে অনেকাংশে বাস্তবায়ন সম্ভব। 

প্রসঙ্গত, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গত ২৮ আগস্ট প্রথম ইশতেহার ঘোষণা করে ছাত্রদল। এরপর গত ৩০ আগস্ট মধুর ক্যান্টিনে আট দফা ইশতেহার ঘোষণা করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল। ৩১ আগস্ট মধুর ক্যান্টিনে ইশতেহার দেয় সাতটি বাম ছাত্র সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’। আর ১ সেপ্টেম্বর ডাকসু ভবনের সামনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ৩৬টি বিষয় সংস্কার করার লক্ষ্য জানিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করে। গত মঙ্গলবার মধুর ক্যান্টিনে ১১ দফা ইশতেহার দেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেল ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ ও স্বতন্ত্র প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ। এ ছাড়া এদিন ইশতেহার ঘোষণা করেছেন স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী আব্দুল ওয়াহেদ।

বিভিন্ন প্যানেলের এসব ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্যানেলগুলোর ভাষ্যÑ নির্বাচিত হলে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণে কাজ করবেন প্রার্থীরা। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের বৈধ সিটের ব্যবস্থা করা হবে। এর মধ্যেÑ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যসহ অন্যান্য প্যানেলের ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে হলগুলোর গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি বাতিলের বিষয়টি। এসব দলের প্রার্থীদের ভাষ্য, আবাসন সমস্যাকে পুঁজি করে বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ার বিনিময়ে গণরুমে শিক্ষার্থী তুলত। এক কক্ষে অসংখ্য শিক্ষার্থী মানবেতর জীবন-যাপন করে। আর ম্যানার শেখানোর নামে গেস্টরুমে ডেকে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়। নির্বাচিত হলে এ দুটি প্রথা বিলোপ করা হবে।

এ ছাড়া প্যানেলগুলো ইশতেহারে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, হলে প্রবেশের সময়সীমা বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ক্লাস উপস্থিতি শিথিল, স্যানিটারি প্যাড বিতরণ, সাইবার বুলিং প্রতিরোধসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ও। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বীমা চালু, মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকীকরণ, বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি, হলগুলোতে ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। গবেষণাগার আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তৈরি, বিদেশে অবস্থানরত অ্যালামনাইদের সম্পৃক্তি, পরিবহন খাত ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্যানেলগুলো।

নির্বাচনী এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে কী করণীয়Ñ এ প্রসঙ্গে লিটন নন্দী বলেন, আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট বডিতে স্টুডেন্ট প্রতিনিধি যুক্ত করা এবং সিনেটে যেমন স্টুডেন্ট প্রতিনিধি সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন; তেমনই ডাকসুর ভিপি এবং জিএসসহ অন্যদের ক্ষমতা আরও বাড়ানো উচিত। 

আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ বাড়ছে

এদিকে শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। প্রচারণার শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠলেও শেষ সময়ে এসে এটি যেন মাত্রা ছাড়া হয়ে গেছে। 

ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ধারা ৯(গ) এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো প্রার্থী স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ধরনের সেবামূলক কাজে অংশ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া কোনো ধরনের উপঢৌকন বিলি-বণ্টন করা যাবে না। এমনকি আপ্যায়ন করানো, অর্থ সহযোগিতা কিংবা অনুরূপ কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া যাবে না। এ ধরনের কার্যক্রম সুস্পষ্টভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। তবে আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না প্রার্থীরা। ডাকসুকে কেন্দ্র করে প্রতিরাতেই রমরমা খাওয়া-দাওয়া চলছে। এ ছাড়াও, টাকা ছড়ানোর অভিযোগ এসেছে কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে। 

জানা গেছে, কবি জসীমউদ্‌দীন হল ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের এক্সটেনশন, আইবিএ ক্যান্টিন, নীলক্ষেতের মামা হোটেল, পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার ও আজিমপুরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে প্রতিরাতেই ভোটারদের খাওয়াতে নিয়ে যান প্রার্থীরা। ছাত্রদল, শিবির ও বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ বেশি পাওয়া গেছে। 

কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের এক্সটেনশনে ১৩২ জনকে আচরণবিধি ভঙ্গ করে খাওয়ানোর অভিযোগ ওঠে ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বাধীন আহমেদের বিরুদ্ধে। পরে, একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় তাকে শোকজ করে নির্বাচন কমিশন। এদিকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাই প্রার্থীদের প্রধান টার্গেট বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন নামে-বেনামে, অঞ্চল ও ব্যাচভিত্তিক ভোটারদের নিয়ে প্রতিরাতেই বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। 

এ বিষয়ে কথা হয় ১ম বর্ষের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন প্রার্থীরা আমাদের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে ‘বড় ভাইয়েরা নিষেধ করেছেন’ বলে জানান তিনি। 

খাবারের বিষয়টি ছাড়াও আচরণবিধির অন্য দিকগুলোও মানা হচ্ছে না। প্রচারণায় বহিরাগতের উপস্থিতি, প্রার্থীদের পোস্টার বিকৃত করা ও নির্ধারিত সময়ের পরেই প্রচারণা চালানোর বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। 

এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, বড় ছাত্র সংগঠনগুলোকে নির্বাচন কমিশন ছাড় দিচ্ছেন। তারা বারবার আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তারা প্রতিরাতে ভোটারদের খাওয়ালেও সেটা তাদের চোখে ধরা পড়ছে না। তিনি নির্বাচন কমিশনকে ‘অথর্ব’ উল্লেখ করে বলেন, তাদের কাছে বারবার অভিযোগ জানানোর পরেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এমন চলতে থাকলে একচেটিয়া নির্বাচন হবে। 

সার্বিক বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. জসীম উদ্দিন বলেন, আমাদের কাছে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ এলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। জিয়া হলের ঘটনায় একজনকে শোকজ করা হয়েছে। এ ছাড়া, অন্যান্য ঘটনায়ও আমরা বিধিমালা মোতাবেক ব্যবস্থা নিয়েছি। তাই আচরণবিধি ভঙ্গ করে কেউ পার পেয়েছেÑ এমন অভিযোগ সত্য নয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা